র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনে বিল, সংসদে তর্ক-বিতর্ক


এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের লক্ষ্য জাতীয় সংসদে বিল আনা হয়েছে। ২০০৩ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অরডিন্যান্স সংশোধন করে র‍্যাব গঠনের ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল। এখন সেটা বাতিল করে নতুন আইন করার পাশাপাশি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পুলিশের জন্যও নতুন একটি আইন করা হচ্ছে। সে বিলটিও আজ সংসদে তোলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল’ সংসদে তুলতে গেলে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি এসআরবি নামে নতুন এলিট ফোর্স গঠনের আগে সংসদে বিশদ আলোচনার দাবি জানান।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও একই আহ্বান জানান। এটি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতর্ক হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে বিলটি পরীক্ষা করে ৪ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

‘র‍্যাবের বিকল্প বাহিনী গঠনে তাড়াহুড়ো নয়’

র‍্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নতুন কোনো এলিট ফোর্স গঠনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “নতুন বাহিনী গঠন করতে হলে সরকারের পাশাপাশি বিরোধীদলসহ সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে বিষয়টি নিয়ে আরো হোমওয়ার্ক করা প্রয়োজন।”

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

র‍্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি ঘোষণা দিয়েছিল, সরকার গঠন করতে পারলে র‍্যাব রাখা হবে না। ফলে সংস্থাটি বিলুপ্তির উদ্যোগকে তিনি সেই অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন।”

তিনি বলেন, “র‍্যাবের মতো অতি বিতর্কিত এবং আমি বলব, একটা ঘৃণিত পর্যায়ে সংস্থাটি যে পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, বিএনপি আমরা সবাই নির্বাচনের আগে বলেছিলাম নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে আমরা এই সংস্থা রাখব না।”

র‍্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, “এটা বিলুপ্তির যে প্রস্তাব এনেছেন, এটাকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করি এবং ধন্যবাদ জানাই।”

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় র‍্যাবের পরিবর্তে নতুন কোনো এলিট ফোর্স প্রয়োজন হলে সেটি কীভাবে গঠন করা হবে, তার কাঠামো ও দায়িত্ব কী হবে এসব বিষয় আগে ঠিকভাবে পর্যালোচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তিনি বলেন, “পাশাপাশি আরেকটা এলিট ফোর্সের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে অথবা নতুন করে যেটাই হোক, এটা গঠনের প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে।”

নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “শুধু নাম কিংবা পদ্ধতি বদলে একই ধরনের একটি বাহিনী তৈরি করা হলে জনগণের মধ্যে ভিন্ন কোনো প্রত্যাশা তৈরি হবে না। বরং নতুন ব্যবস্থার ধারণা ও উদ্দেশ্যেও মৌলিক পরিবর্তন থাকতে হবে।”

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বিলুপ্তি আমাদের অঙ্গীকার ছিল। এটা হয়ে যাক। এখন নতুন করে এরকম একই ধরনের পারসেপশন যাবে জনগণের কাছে যেটা এমন কিছু না, হয়তোবা জাস্ট অ্যাপ্রোচ চেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু জাতির সামনে যদি আমরা বলতে পারি, না, অ্যাপ্রোচ চেঞ্জ হয়নি, তার টোটাল কনসেপ্টটাই চেঞ্জ হয়েছে—সেরকম ভালো একটা জিনিস আমরা আনতে পেরেছি।”

সংসদে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি বলেন, “বর্তমানে সাইবার স্পেসে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় সরকারি দল, বিরোধীদল ও সাধারণ মানুষ সবাই কোনো না কোনোভাবে ভুক্তভোগী হতে পারেন। এ কারণে সাইবার নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “মাননীয় মন্ত্রী তার বক্তব্য বা বিবৃতিতে এইমাত্র যেটা বললেন যে সাইবার স্পেসে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এটার ভিকটিম সরকারি দল, বিরোধীদল এবং সাধারণ মানুষ সবাই। অবশ্যই একটা সুরাহা হওয়া উচিত।”

মন্ত্রী সাইবার সিকিউরিটি ফোর্স গঠনের সম্ভাবনার কথা বলেছেন উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, “মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি তা সমর্থন করবেন।”

তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে তিনি মেনশন করেছেন যে হয়তোবা একটা সাইবার সিকিউরিটি ফোর্স আমাদের বিল্ডআপ করা লাগতে পারে। সেরকম ভালো কিছু করলে আমরা অবশ্যই সমর্থন দেব।”

তবে নতুন বাহিনী কোনোভাবেই মানুষের ওপর দমন-পীড়নের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয় বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, “এ ধরনের বাহিনীর মূল লক্ষ্য হতে হবে নাগরিকের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা।”

র‍্যাব বিলুপ্তির বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন বাহিনী গঠনের প্রস্তাব নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলকে আরো আলোচনার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, “তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সবাইকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা ভবিষ্যতের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

‘প্রতিষ্ঠানের দোষ নেই, নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহিতা’

র‌্যাব বিলুপ্ত করে নতুন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) গঠনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বা অপরাধ হলে পুরো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা ঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেখানে জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে।”

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ বিল উত্থাপনের সময় তিনি এসব কথা বলেন।

ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন চলাকালে বিলটি উত্থাপনকে কেন্দ্র করে নতুন বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা, কাঠামো, ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনি ইশতেহার ও জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী র‌্যাব নামের সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তবে বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধ, জুয়া, মাদক, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ধরন পাল্টে গেছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের অধীনে একটি আধুনিক, প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে।”

তিনি বলেন, “সেই প্রয়োজন থেকেই পুলিশের আওতায় ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন বাহিনীকে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”

র‌্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন বা কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো যায় না।”

তিনি বলেন, “পুলিশ বাহিনীর প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর। তাই বলে আমরা পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করে দেব? মাথা ব্যথা হলে মাথা কর্তন করা যায় না।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, “কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কিংবা মাফিয়া শক্তির প্রভাব বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধ থাকতে পারে। কিন্তু সেই কারণে প্রতিষ্ঠানটিকেই বিলুপ্ত করা সমাধান নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই মূল বিষয়।”

নতুন এসআরবি নিয়ে সংসদকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত আইনে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে রাখা হয়েছে। বাহিনীর কোনো সদস্য শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যে কমিটি থাকবে, সেখানে শুধু সরকারি কর্মকর্তারাই থাকবেন না; বেসরকারি সদস্য, মানবাধিকারকর্মী ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকেও রাখা হবে।”

তিনি বলেন, “এর ফলে নতুন বাহিনীর সদস্যদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি থাকবে এবং কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “র‌্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে একই ধরনের কোনো বাহিনী তৈরি করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়। পরিবর্তিত অপরাধ পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও পেশাদার একটি বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।”

তিনি বলেন, “নতুন বাহিনীর কাজ হবে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, মাদক ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “নতুন বাহিনীর সদস্যদের ক্ষমতার পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো সদস্য আইন লঙ্ঘন করলে বা অসদাচরণে জড়ালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।”

তিনি বলেন,“জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি দক্ষ বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন। তবে সেই বাহিনীকে অবশ্যই আইনের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করাই হবে নতুন বাহিনীর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।”

‘র‌্যাব ফ্যাসিবাদের প্রতীক’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‍“ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন সেলের কারণে র‌্যাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল।”

নাহিদ বলেন, “নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দল র‌্যাব বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিএনপিও এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।”

নাহিদ ইসলাম বলেন, “র‌্যাব ফ্যাসিবাদের প্রতীক। এটি বিলুপ্ত করা উচিত। যদি একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়, তাহলে আগে সংসদে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে।”





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *