ভারতে জেন-জির পর আন্দোলনে জেন আলফারা, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার দাবি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গড়ে ওঠা সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে ভারতে প্রশ্ন ফাঁস রোধ ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ঘিরে গত জুলাইতে শুরু হওয়া জেন জি-দের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতে। এর ফলাফলে দেশটির তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে প্রবল রাজনৈতিক ঢেউ তুলে ভারতেও জেন জি অর্থাৎ তরুণ যুবাদের আন্দোলন দিল্লির নরেন্দ্র মোদী সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, জেন-জি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মোদী সরকার তাদের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
এবার ভারতে শুরু হয়েছে জেন আলফা প্রজন্ম অর্থাৎ স্কুল পড়ুয়া শিশু-কিশোরদের আন্দোলন। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রাজপথে নেমেছে তারা।
আল জাজিরায় শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেন আলফা প্রজন্মের এ আন্দোলন কেবল ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ নয়, বরং তরুণদের সমর্থন ধরে রাখতে হিমশিম খাওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্যও আরেকটি নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া ‘জেনারেশন জেড’ বা ‘জেন জি’ হল ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। এরাই প্রথম প্রজন্ম যারা খুব ছোটবেলা থেকে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বলা হচ্ছে জেন আলফা। এ প্রজন্মের শিশু-কিশোররা এমন এক যুগে বড় হচ্ছে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ট্যাবলেট ও ডিজিটাল স্ক্রিন তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়, সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের সমূহি ভাতপুরওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ১০টি রাজ্যের গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীরা জীর্ণ স্কুল ভবন, শিক্ষক সংকট, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি ও নিম্নমানের মিড ডে মিলের প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন ও বিক্ষোভ করেছে।
এই আন্দোলন প্রথম শুরু হয় গত ২২ অগাস্ট ভাতপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। সেখানকার ১২২ জন শিক্ষার্থী সম্প্রতি ক্লাসে যেতে অস্বীকার করে। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকে ছয় বছর বয়সিও আছে। তাদের দাবি ছিল, নতুন ভবন তৈরির জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে যাবে না।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের কারণ স্কুলটির বর্তমান ভবনে জরাজীর্ণ অবস্থা। ২০২৩ সালে এখানে একটি দেয়াল ভেঙে পড়ে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হয়। এরপর থেকে ভবনের একটি অংশ এখনও ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। সেই ঘটনার পর থেকেই শিশুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন ভবনের দাবি জানিয়ে আসছিল।
গত ২২ অগাস্ট শিশুরা ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে নামলে প্রথমে বিষয়টি কেউ পাত্তা দেয়নি। কিন্তু ক্রমেই দশ বছরের কম বয়সি শিশুরা স্কুল কর্তৃপক্ষ ও সরকারি কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে বলে বিভিন্নভাবে খবর হতেই শিক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্কুল পরিদর্শনে আসেন।
ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক অবস্থি শিশুদের আশ্বাস দেন, দ্রুত একটি নতুন ভবন তৈরি করা হবে। ততক্ষণে প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসায় শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে যেতে রাজি হয়।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৮ বছর বয়সি শিশু প্রিয়া আল জাজিরাকে বলে, “আমি খুশি। আমরা একটি নতুন ভবন পাব। আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি কখন স্কুলের ভবনটি ধসে পড়ে। এর অবস্থা খুবই খারাপ। ভয়ের কারণে আমরা পড়ালেখায় মন দিতে পারি না। এই কারণেই আমরা সবাই প্রতিবাদ করেছি।”
শুধু উত্তরপ্রদেশের সমূহি ভাতপুরওয়া নয়, গত জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড এবং মধ্য প্রদেশসহ ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা একই ধরনের প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে বলে দাবি করেছে আল জাজিরা। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, বিশেষ করে যেসব গ্রামীণ এলাকার সরকারি স্কুলগুলো অবহেলার কারণে জীর্ণ হয়ে পড়েছে, সেখানেই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে।
নয়া দিল্লিতে গত জুনে সিজেপির প্রবল আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে আল জাজিরা বলছে, মোদী সরকার প্রতিবাদকারীদের ক্ষোভ প্রশমন বা তাদের সঙ্গে কথা না বলে উল্টো আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট ‘চরমপন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল। এর ফলে সরকারের ওপর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে ভারতের বিশাল বেকারত্ব ও দুর্নতি কেন্দ্রীক সংকট আন্দোলনের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সরাসরি অধীনে থাকা নিরাপত্তা বাহিনী যখন ভারতের পার্লামেন্টের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে পদযাত্রা করা আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও দমন পীড়ন চালায়, তখন ‘জেন-জি’ বা যুব আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। জুলাই মাস জুড়ে তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হন।
আল জাজিরার মতে, সমুহি ভাতপুরওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখন এমন কিছু করছে যা ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিরল। কারণ তারা শিক্ষক এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জেন-জি আন্দোলনের পরপরই আসা এই তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকারীদের ব্যাপকভাবে ‘জেন অ্যালফা’ আন্দোলনের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্কুল ব্যবস্থা পরিচালনা করে, যেখানে প্রায় ১৫ লাখ স্কুলে ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এসব স্কুলের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিচালিত হয় কেন্দ্রীয়, রাজ্য বা স্থানীয় সরকার দ্বারা। বাকি অংশ চ্যারিটি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু এসব স্কুল অবকাঠামো, শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত।
আল জাজিরার দাবি, সরকারিভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষার্তী ঝরে পড়ার হার কমার কথা বলা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হল ভারতে প্রতি ২৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছে। আবার কিছু স্কুলের পড়াশোনা এমন ভবনে চলে যা মূলত গবাদি পশু পালনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক শিক্ষা অধিকার কর্মী নাগাসিমহা রাও বলেন, “শিশুরা তাদের অধিকার দাবি করছে। তারা শিক্ষক, বেঞ্চ, স্কুল ভবন, খাবার পানি, বিদ্যুৎ এবং টয়লেট চায়। দুর্ভাগ্যবশত দীর্ঘদিন ধরে স্কুল পরিচালনার মৌলিক অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব রয়েছে। সারা দেশের বেশিরভাগ সরকারি স্কুলেরই এটি বাস্তব চিত্র।”
এসব স্কুলে কি গরিব শিশুরা পড়াশোনা করে বলেই এই অবহেলা- প্রশ্ন তুলে নাগাসিমহা বলেন, সরকারি স্কুলগুলোতে পড়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক সম্প্রদায় থেকে আসা।
জেন-আলফার চলমান এই আন্দোলনের প্রথম সারির একটি ঘটনা বর্ণনা করে উত্তর প্রদেশের ‘সর্বদয়া ইন্টার কলেজ’-এর দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মনোজ বলেন, গত ২৮ জুলাই তারা স্কুলের ইউনিফর্ম পরে প্রতিবাদ শুরু করেন। কারণ তাদের স্কুলে খাবার পানি, বিদ্যুৎ এমনকি বসার বেঞ্চ পর্যন্ত নেই।
মনোজ বলেন, “আমাদের জন্য এই স্কুলে পড়ালেখা করা কতটা কঠিন তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। বিদ্যুৎ নেই, তাই গরম ও ভ্যাপসা গরমে ফ্যান চলে না। আমাদের কোনো খাওয়ার পানির সুবিধা নেই। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মেঝেতে বসতে হয়। তাই আমরা আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
মনোজের বন্ধু ও সহপাঠী নীলম বলেন, “ছাত্র-ছাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব মৌলিক সুবিধার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিল। এবার আমরা প্ল্যাকার্ড ও স্লোগান দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
পরবর্তীতে একই ধরনের আরও আন্দোলন ছড়ায়। ৩১ জুলাই মহারাষ্ট্রের পারলিতে ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত বৈদ্যনাথ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের জন্য বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা।
জেন অ্যালফাকে জেন-জির সমর্থন
চলমান শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনে জেন-আলফাকে জেন-জি প্রতিনিধিরা সমর্থন করছেন বলে দাবি করেছে আল জাজিরা। গত ১৫ অগাস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে সিজেপি তাদের তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোগ ‘স্কুল ঠিক কর’ কর্মসূচি চালু করে।
সিজেপির আইনি বিষয়ক প্রধান রত্না সিং আল জাজিরাকে বলেন, “শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য আমরা সারা দেশের বিভিন্ন স্কুলের এই আন্দোলনগুলোকে সম্পূর্ণ সমর্থন করছি। দিল্লিতে আমাদের যন্তর মন্তর আন্দোলনের সময় অনেক ছোট শিশু এবং গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা অভিভাবকদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা স্কুলের জরাজীর্ণ অবস্থা, শিক্ষকের অভাব এবং ভাঙাচোরা রাস্তার কথা তুলে ধরেছিলেন। শিশুটির উন্নত ভবিষ্যতের জন্য স্কুলগুলোর ব্যবস্থা ঠিক করা আমাদের এই আন্দোলনেরই একটি স্বাভাবিক অগ্রগতি।”
বাংলাদেশ জার্নাল/জে
