ভার্চুয়াল জগতে আটকে থাকা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?


সাজেদুল ইসলাম রাব্বি

স্মার্টফোন এখন আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। যোগাযোগ, পড়াশোনা, তথ্য সংগ্রহ, কাজ কিংবা নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রয়োজনের জায়গা থেকে কখন যে মোবাইল আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, আর সেই অভ্যাস কখন নির্ভরতায় রূপ নিয়েছে; তা আমরা অনেক সময় নিজেরাই বুঝতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোনের নোটিফিকেশন দেখা, দিনের বিভিন্ন সময়ে অকারণে ফোন হাতে নেওয়া, আবার রাতে ঘুমানোর আগেও শেষবারের মতো পর্দায় চোখ রাখা। যেন দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফোনটি আমাদের সঙ্গেই থাকে। প্রয়োজনের কাজ শেষ হওয়ার পরও সেটি হাত থেকে নামাতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই ধীরে ধীরে ফোন ব্যবহারের ওপর এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা তৈরি হয়।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে। একজন শিক্ষার্থী পড়তে বসেছে, হঠাৎ ফোনে একটি নোটিফিকেশন এলো। সে ভাবল, একবার দেখে আবার পড়ায় ফিরে যাবে। কিন্তু একটি নোটিফিকেশন থেকে আরেকটি ভিডিও, ভিডিও থেকে রিল, আবার কখনো গেম। কয়েক মিনিটের বিরতি কখন যে দীর্ঘসময়ের অপচয়ে পরিণত হয়, তা বোঝার আগেই পড়াশোনার সময়টুকু চলে যায়। শুধু সময়ের অপচয় নয়, দীর্ঘসময় ধরে কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাসও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ছোট ছোট ভিডিও, দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য আর একের পর এক নতুন কনটেন্ট দেখার অভ্যাস আমাদের ধৈর্য কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘ কোনো লেখা পড়া কিংবা একটি শিক্ষামূলক ভিডিও মনোযোগ দিয়ে শেষ করার আগ্রহও অনেকের মধ্যে কমে যাচ্ছে। পর্দায় নতুন কিছু আসার অপেক্ষাই যেন মনকে ব্যস্ত রাখছে।

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে পরিবারের সদস্যরা যখন একসঙ্গে বসেন; তখনো অনেকের চোখ থাকে ফোনের পর্দায়। একই ঘরে থেকেও কথা কম হয়, অথচ ভার্চুয়াল জগতে যোগাযোগ চলতে থাকে অবিরাম। একসময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে দিনের গল্প করার যে স্বাভাবিক অভ্যাস ছিল, তার জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে নীরবতা আর মোবাইল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু বাস্তব জীবনের আন্তরিক কথোপকথন অনেক ক্ষেত্রেই কমছে। আমরা অনেক মানুষের অনলাইন জীবন সম্পর্কে জানি। অথচ পাশের মানুষটির ভালো-মন্দের খবর হয়তো রাখি না। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব বাড়লেও বাস্তব জীবনের একাকিত্ব কখনো কখনো আরও গভীর হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বিষয় ভাবার মতো। এখানে মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোই তুলে ধরে। আনন্দের ছবি, সফলতার গল্প, ভ্রমণ কিংবা সাজানো কোনো সুন্দর মুহূর্ত। ফলে অন্যের দেখানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনকে তুলনা করে অনেকের মধ্যে অপূর্ণতা, হতাশা কিংবা হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে। মনে হতে পারে, সবাই ভালো আছে, শুধু আমিই পিছিয়ে আছি। অথচ আমরা ভুলে যাই, অন্যের জীবনের কয়েকটি সুন্দর মুহূর্ত দেখে নিজের পুরো জীবনকে বিচার করা যায় না।

অন্যদিকে শিশুরাও মুক্ত নয়। শিশুকে শান্ত রাখা কিংবা ব্যস্ত রাখার জন্য অনেক পরিবার সহজ সমাধান হিসেবে তার হাতে মোবাইল তুলে দেয়। প্রথমে কয়েক মিনিট, পরে আরও কিছুটা সময়। একসময় ডিভাইসটিই শিশুর বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। নিয়মিত এমন অভ্যাস চলতে থাকলে শিশুর আচরণ, মনোযোগ ও দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে। তখন মোবাইল সরিয়ে নেওয়াটাই পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।

তবে মোবাইল ফোন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পুরোপুরি খারাপ বলারও সুযোগ নেই। একই প্রযুক্তি কারো সময় নষ্ট করছে, আবার কেউ সেটি ব্যবহার করেই নতুন কিছু শিখছে। অনলাইন শিক্ষা, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ, দক্ষতা অর্জন কিংবা কাজের নতুন সুযোগ তৈরিতে মোবাইলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমস্যাটি প্রযুক্তির মধ্যে নয় বরং আমরা সেটিকে কীভাবে ব্যবহার করছি তার মধ্যে। বর্তমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের পরিচিত থাকতেই হবে। মোবাইল বা ডিজিটাল ডিভাইস পুরোপুরি বাদ দিয়ে চলা বাস্তবসম্মত নয়। বরং আমাদের ভাবতে হবে, ফোনটি কতক্ষণ ব্যবহার করছি, কী কাজে ব্যবহার করছি এবং প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও কেন সেটি হাতে ধরে রাখছি। প্রয়োজনের সময় মোবাইল একটি কার্যকর হাতিয়ার। কিন্তু প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও যদি আমরা সেটিকে নামিয়ে রাখতে না পারি; তখন সেই হাতিয়ারই ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

এখানে পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে মোবাইল কম ব্যবহার করতে বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিশুরা অনেক সময় কথার চেয়ে বড়দের আচরণ দেখে বেশি শেখে। বাবা-মা নিজেরাই যদি দিনের বড় একটি সময় ফোনে ব্যস্ত থাকেন। তাহলে সন্তানের কাছে শুধু মোবাইল কম ব্যবহারের পরামর্শ কতটা কার্যকর হবে, সেটিও ভাবতে হবে। পরিবর্তনের শুরুটা পরিবার থেকেই হওয়া দরকার। এর জন্য খুব বড় কোনো সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট অভ্যাস দিয়েই শুরু করা যায়। নির্দিষ্ট সময় ফোন ব্যবহার করা, পড়ার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, ঘুমানোর আগে ফোন দূরে রাখা, খাবারের সময় ফোন ব্যবহার না করা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছুটা সময় ফোন ছাড়া কাটানো। এসব অভ্যাস হয়তো ছোট, কিন্তু নিজের সময় ও মনোযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষপর্যন্ত প্রশ্নটি মোবাইল ফোন ভালো না খারাপ, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, মোবাইল ফোন কি আমাদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে আমাদের সময়, মনোযোগ ও জীবনকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করছে? আমরা মোবাইল ব্যবহার করছি, নাকি মোবাইলই আমাদের ব্যবহার করছে? প্রশ্নটি সহজ। উত্তরটাও হয়তো আমরা জানি। শুধু নিজের কাছে সৎভাবে স্বীকার করার প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার আগে আমাদের নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

এসইউ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *