রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ-সন্ধান | প্রথম আলো


এর সঙ্গে মিলে ছিল আরেকটি ব্যাপার। পূর্বদেশের সমাজ আর পশ্চিমা রাষ্ট্র যদি আপন বৈপরীত্য বজায় রেখে মিলতে পারে, তবে গোটা বিশ্বকে একই সামাজিক প্রক্রিয়ার রকমফের হিসেবে দেখার প্রয়োজন পড়বে না। একই সময়ে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুস্থানীয় ব্রজেন্দ্রনাথ শীল এ রকমই একটি দাবির একটি দার্শনিক ভিত্তি দেন পশ্চিমা দর্শনের ভাষায়। ব্রজেন্দ্রনাথের ভাষায়, বিশেষ দেশের বিশেষ ‘ব্যক্তিত্বকে’ প্রাধান্য দিয়ে যে বিশ্বসমাজ রচিত, কেবল তাকেই বলা যায় ‘Universal Humanity’ (১৯১১, ১২)। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বিচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যস্থাপন।’ (১৩১২, ৫০)

এভাবে স্বদেশের অবয়ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে পুরোনো দ্বিধা ছিল, তার সাময়িক এক সমাধান মিলল। স্বদেশের আরেক নাম হয়ে দাঁড়াল সমাজ। যে সমাজ যৌথ, আপন নিয়মে চালিত, তবু আধুনিক জ্ঞানকাণ্ডের সোসাইটি নয়। আর স্বদেশ-সংশয়ের এই অবসান সম্ভব করে তুলল স্বদেশপ্রেমের নতুন এক ভাষা।

৪.

ভারতবর্ষের রাজনীতিকেই রাষ্ট্রের পরিসর থেকে মুক্ত করে কেবল সমাজের মধ্যে আবদ্ধ রাখাটা সমসাময়িক রাজনৈতিক চেতনার ধারকেরা সদয়ভাবে দেখেননি। রাষ্ট্রচিন্তা কীভাবে নকলবৃত্তিতে পর্যবসিত হয়, সেটা দেখাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ সমাজের ওপর যেভাবে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তা যারপরনাই আধুনিক গণতন্ত্রের মন্ত্রে উজ্জীবিত উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে তুষ্ট করতে পারেনি। স্বদেশি সমাজের প্রায় এক যুগ পর—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিগর্ভে বসে—রবীন্দ্রনাথ যখন জাপান ও মার্কিন মুল্লুকে তাঁর জগদ্বিখ্যাত ন্যাশনালিজম নামক বক্তৃতা দিলেন, ঠিক একই সমালোচনার শেল বর্ষিত হলো পশ্চিমের যুদ্ধ-অক্লান্ত বুদ্ধিজীবী মহল থেকে। বহুদিন তাঁর নামের সঙ্গে ‘অ্যান্টি-পলিটিক্যাল’ তকমা লেগে রইল। আধুনিক রাজনীতির ব্যাকরণের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সন্দিগ্ধ মনোভাব নিয়ে আমরা নানা প্রশ্ন তুলতেই পারি, তবে এটাও অনস্বীকার্য যে রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নগুলো বনিয়াদি, চিন্তার প্রাথমিক অনুমানগুলো নিয়ে।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশসন্ধানের মর্ম আরও বৃহৎ। পাঠক জানবেন যে ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ রচনার যুগে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপর্বের গানের এক বিশেষ স্ফূর্তি ঘটে। ‘আমার সোনার বাংলা’ লিখিত হয় ওই সময়ে; হয় ‘ও আমার দেশের মাটি,’ ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ এবং আরও নানা বিখ্যাত গান। স্বদেশি আন্দোলনের যুগ হয়ে ক্রমে সেই সব গান রাজনৈতিক ভাষার অবয়বে মিশে যায়।

অভাব ও অপূর্ণতার আক্ষেপ এক পিঠে, আরেক পিঠে আত্মগরিমা—এই দুইয়ে মিলে স্বদেশপ্রেমের যে পরিচিত ভাষা, তার চিহ্ন স্বদেশি রবীন্দ্রনাথে পাওয়া যায় না। সমাজের অভাবী পূর্ণতা আর ঐক্যগুণ এই স্বদেশপর্বের গানে ‘মা’ ডাকে ভূষিত হয়। এই স্বদেশপ্রেমের ভাষায় গৌরবের বাহুল্য নেই; আছে পূর্ণতা, প্রকৃতির রূপকে। তাতে রূপান্তরের বাসনা নেই, নেই কোথাও পৌঁছানোর তাড়না। ‘গরিবের ধন যা আছে, তাই দিব চরণতলে’—এই সংকল্প আছে। সমাজ-দর্শন দিয়ে স্বদেশের যে মানে তিনি দৃশ্যমান করে তুলতে চাচ্ছিলেন, তারই আরেক রূপ ধরা পড়ে এই গানগুলোতে।

তাই এসব গানের গূঢ়ার্থ ধরতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনার জানালা দিয়ে দেখতে হবে। রবীন্দ্রনাথের সমাজদর্শনের উপযোগিতা আমরা যেভাবেই বিচার করি না কেন, সেই দর্শনের ফলে স্বদেশজ্ঞানের যে ভাষা তৈরি হয়, তা পরাক্রমী গর্বে নয়; বরং আত্মজ্ঞান ও আত্মশক্তির প্রতিশ্রুতিতে তাড়িত ছিল। আর তাই আধুনিক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে সংশয়ী থেকেও রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতার ছায়াতল একেবারে ছেড়ে যাননি।

৫.

সহজিয়াভাবে সচরাচর সিক্ত হলেও স্বদেশ সহজ কোনো সত্তা নয়। জাতি, সম্প্রদায়, লোক—নানারূপে তা বোধগম্য হয়ে উঠতে পারে। সমকালের চলতি কোনো উত্তরে রবীন্দ্রনাথ তুষ্ট ছিলেন না। রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক সম্পর্কের সমীকরণকে এক পাশে সরিয়ে তাঁর স্বদেশসন্ধান সূচিত হয়। সেই জিজ্ঞাসার এক বিশেষ বহিঃপ্রকাশ হয় স্বদেশিযুগের গান ও সাহিত্যে, যা স্বদেশ নামক বস্তুকে প্রেম ও সাধনার নতুন এক ভাষায় বোধগম্য করে তোলে। এই নতুন স্বদেশপ্রেমের ভাষা একদা বাংলার জাতীয়তাবাদে মিশে গিয়ে তাকেও রূপান্তরিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশসন্ধান ও প্রাপ্তির ফল—এই হিসাবে সুদূরপ্রসারী।

সূত্র

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আত্মশক্তি; কলকাতা: মজুমদার লাইব্রেরি, ১৩১২ বঙ্গাব্দ।

২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; রবীন্দ্র-রচনাবলি (সুলভ সংস্করণ), সপ্তদশ খণ্ড; কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৪০৭ বঙ্গাব্দ।

৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; বঙ্কিম রচনাবলি, দ্বিতীয় খণ্ড; কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৩৬১ বঙ্গাব্দ।

৪. ব্রজেন্দ্রনাথ শীল; ‘মিনিং অব রেস, ট্রাইব’, পেপারস অন ইন্টার–রেশিয়াল প্রব্লেমস: কমিউনিকেটেড টু দ্য ফার্স্ট ইউনিভার্সাল রেসেস কংগ্রেস অ্যাট দ্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, জুলাই ২৬–২৯, ১৯১১; গুস্তাভ স্পিলার সম্পাদিত, পৃষ্ঠা ১–১২; লন্ডন: পি এস কিং অ্যান্ড সন, ১৯১১।

নাজমুল সুলতান: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *