বগুড়ায় ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রযুক্তিটির পরীক্ষামূলক কার্যকারিতাও প্রমাণিত হওয়ায় ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) গবেষণায় জ্বালানি ছাড়াই এ প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দুটি পানির পাম্প ও একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চালানো হচ্ছে। বগুড়া শহরের এরুলিয়ার বানদিঘী এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপিত প্ল্যান্টে বর্তমানে ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি মোটরের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে প্ল্যান্টটি পরিদর্শন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা এবং আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক। এ সময় ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ও মোটর চালু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা দিয়ে পাম্প ও ওয়েল্ডিং মেশিন চালানোর কার্যক্রম দেখানো হয়।
আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ২০১০ সালের পর গবেষণায় গতি আসে। ২০১৪ সাল থেকে প্রযুক্তিটি নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু হয়। আর্থিক সংকটে মাঝখানে গবেষণা কিছুটা ধীরগতির হলেও পরে তা আবার শুরু হয়। ২০২৫ সাল থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম আরো বিস্তৃতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
গবেষক ও আরডিএর উপ-পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের তৈরি জেনারেটরটি সম্পূর্ণ কাস্টমাইজ করা। এতে রোটর অংশে পার্মানেন্ট ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়েছে। ১ মেগাওয়াটের জেনারেটরের জন্য প্রায় ৪৮টি পোল ও ম্যাগনেট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ম্যাগনেটের দাম বেশি হওয়ায় জেনারেটরের আকারও বড় হবে। পূর্ণাঙ্গ ১ মেগাওয়াটের প্ল্যান্টে জেনারেটরের উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট হতে পারে।
তিনি জানান, বর্তমানে জেনারেটরটি ১ হাজার ৪৫০ আরপিএম গতিতে ঘুরলেও তা কমিয়ে ২৫০ আরপিএমে এনে ব্যবহার করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ও উন্নত প্ল্যান্টে এই গতি আরো কমিয়ে ১২০ আরপিএমে আনা হবে। এতে আরো স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। বর্তমানে এটি ল্যাব বা প্রাথমিক পর্যায়ের একটি ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি যুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট তৈরি করা গেলে প্রাথমিকভাবে যে বিদ্যুৎ দিয়ে সিস্টেমটি চালু করা হবে, পরবর্তীতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়েই প্রাইম মুভার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ড. মনিরুল ইসলাম আরো জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি নানা দাবি করলেও তাদের গবেষণাটি বৈজ্ঞানিক, তাত্ত্বিক ও পরীক্ষামূলক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং সেই তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।
আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক জানান, এটি ফ্লাইহুইলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ব্যবহার না করে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, সেই সম্ভাবনা থেকেই ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে।
ড. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক আরো জানান, বাংলাদেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৪ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। সেখানে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হতে পারে মাত্র ১ টাকা ৫০ পয়সার মতো। আরডিএতে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি প্ল্যান্ট স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং জলবায়ু ট্রাস্টে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এ প্রযুক্তির অন্যতম সুবিধা হলো এটি সূর্যের আলো বা আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে, জ্বালানি সংকটের সময় বিকল্প হিসেবে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা বলেছেন, “মাত্র ১ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্তমান মেশিনটি তৈরি করা সম্ভব। সরকার এ প্রকল্পে পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়ন করলে এ ধরনের মেশিন তৈরি করে বাজারজাত করা সম্ভব হবে।”
প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়েছেন রেজাউল করিম বাদশা এমপি।
