৭৪ লাখ টাকার স্কলারশিপ পেলেন দরিদ্র পরিবারের মেয়ে জেমি
অর্থাভাবে একসময় পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস জেমির। তবে কোনো প্রতিকূলতাই তাকে দমাতে পারেনি। কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এইচএসসি পরীক্ষায়। এবার স্বপ্নপূরণের আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন জেমি। উচ্চশিক্ষার জন্য পেয়েছেন বিশেষ বৃত্তি।
জেমি চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়াশোনার জন্য প্রায় ৭৩ লাখ টাকার (৬০ হাজার মার্কিন ডলার) স্কলারশিপ (বৃত্তি) পেয়েছেন। চার বছর মেয়াদি এ বৃত্তির আওতায় প্রতিবছর তিনি ১৫ হাজার মার্কিন ডলার করে পাবেন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির পরিচালক মৌরি রহমান চিঠি দিয়ে জান্নাতুলকে বৃত্তি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শায়েস্তাগঞ্জ জহুর চান বিবি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি আমাদের ছাত্রী। তার এ অর্জনে আমরা গর্বিত।
তিনি বলেন, জান্নাতুলের এ অর্জন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। সদিচ্ছা, প্রচেষ্টা ও প্রতিভার সমন্বয় থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কাঙিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো যে সম্ভব জান্নাতুল তার প্রমাণ।
মেয়ের এই অর্জনে আবেগাপ্লুদত বাবা আফজল আলী বলেন, ‘মেয়েকে পড়াশোনা করানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। মেয়ে বৃত্তি পাওয়ায় এখন চিন্তামুক্ত হয়েছি। এখন মেয়ে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করবে। এগিয়ে যাবে। তাই মেয়েকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি।’
বৃত্তি পাওয়ার খবর প্রথমে নিজেরও বিশ্বাস হয়নি জানিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি বলেন, ‘এরকম একটি বৃত্তির কথা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বারবার চিঠি পড়ে বিশ্বাস তৈরি করছিলাম। এখন নিজেকে প্রস্তুত করছি। আমাকে আরও এগোতে হবে। আমি চাই আরও শিক্ষার্থী যেন এ বৃত্তি অর্জন করতে পারে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দরিদ্র পরিবারের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি। বাড়ি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পশ্চিম লেঞ্জাপাড়া গ্রামে। বাবা আফজল আলী একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। টানাপোড়েনের সংসারে নানা প্রতিকূলতা। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অদম্য এই শিক্ষার্থী এগিয়ে চলেছেন দুর্বার গতিতে।
২০২৫ সালে জহুর চান বিবি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন জেমি। এরপর ২০ জুলাই থেকে শেভরন বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত এক মাসের সামার স্কুল প্রোগ্রামে অংশ নেন। প্রোগ্রামটি সফলভাবে শেষ করার পর শেভরনের সহায়তায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান তিনি।
বিজ্ঞানভিত্তিক ইংরেজি মাধ্যমের সামার স্কুলে অংশ নেওয়া জান্নাতুলের জন্য সহজ ছিল না। তবে নিজের আগ্রহ, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি সফলভাবে প্রোগ্রামটি শেষ করেন।
শিক্ষক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, প্রতিবছর শেভরন বাংলাদেশ জুন মাসে সারাদেশ থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সামার স্কুল প্রোগ্রামের জন্য আবেদন আহ্বান করে। এতে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আবেদন শেষে তাদের থেকে বাছাই করে ৬০-১০০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থীকে নিয়ে চট্টগ্রাম এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদেরকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত একমাস স্কুল প্রোগ্রামিং কোর্স করানো হয়।
সেখানে তাদের প্রত্যেকের পেছনে শেভরনের খরচ হয় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো। প্রোগ্রাম চলাকালেই বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষ মেধা ও অন্যান্য অতিরিক্ত যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে কাদের বৃত্তি দেবে তা বাছাই করে নেয়। এর মধ্যে তারা একটি নিজস্ব তদন্তও করে। যাকে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে তার পারিবারিক অবস্থা কেমন, এটিও তারা বিবেচনায় নেন। তবে এখানে এসএসসি বা এইচএসসির ফলাফল জিপিএ-৫ কি-না তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রোগ্রাম শেষে তারা বৃত্তি ঘোষণা করে।
শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, এবার দুজন বৃত্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে একজন শায়েস্তাগঞ্জের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি।
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এসআর/জেআইএম
