সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে
শিকাগোর উইলিস টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, মানুষ কত উঁচুতে উঠতে পারে। ওয়াশিংটনের স্মৃতিস্তম্ভ, ইন্ডিয়ানার বিস্তীর্ণ ভুট্টাক্ষেত, পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, নায়াগ্রার গর্জন ও টরন্টোর শৃঙ্খলাবদ্ধ নগরজীবন আধুনিক সভ্যতার শক্তির একেকটি প্রতীক। আমেরিকার উন্নত প্রযুক্তি, বিশাল অবকাঠামো ও পরিকল্পিত নগরজীবন আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু দীর্ঘ সফরের শেষে বিস্ময়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে নিজের দেশকে নতুন করে আবিষ্কারের অনুভূতি।
দূরদেশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মাটিকে যেন আরও কাছে অনুভব করেছি। অট্টালিকা বা সম্পদের প্রাচুর্যে আমরা হয়তো পিছিয়ে, কিন্তু আমাদের আছে উর্বর মাটি, পরিশ্রমী মানুষ, ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য, নদী খাল বিলের জলজ সম্পদ এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়ে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা। আমেরিকার দীর্ঘ শীতের বিপরীতে বাংলাদেশের গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত নতুন রূপ দেয়।
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলীসহ অসংখ্য নদী ও জলাভূমি আমাদের ভূপ্রকৃতি, কৃষি ও জীবনকে অনন্য করেছে। স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতি, দারিদ্র্য, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জনসংখ্যার চাপের কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ছিল। অথচ সেই দেশই আজ খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভরতার পথে অনেক দূর এগিয়েছে। তাই দেশের প্রতি ভালোবাসা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, সংগ্রাম ও সাফল্যের কারণেও।
বিদেশের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মনে পড়েছে নিজের দেশের আকাশ, বর্ষার মেঘ, শরতের কাশফুল, হেমন্তের ধান, শীতের কুয়াশা, বসন্তের পলাশ, নদীর ঢেউ আর মাটির সোঁদা গন্ধ। দূরদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও তখন হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসার এক অমোঘ উচ্চারণ ভেসে এসেছে, “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”
ইলিনয়ের গ্রামীণ পথে দিগন্তজোড়া একফসলি ভুট্টাক্ষেত দেখে আমেরিকার কৃষির শক্তি উপলব্ধি করেছি। বৃহৎ খামার, যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় সেচ ও তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনায় একজন কৃষক শত শত একর জমি পরিচালনা করতে পারেন। বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। অধিকাংশ কৃষকের জমি এক থেকে তিন একরের মধ্যে; তবু সেই ক্ষুদ্র জমিতেই ধান, মাছ, হাঁস, সবজি, ফল, গরু ও ছাগল মিলিয়ে বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
আমেরিকায় উৎপাদনের শক্তি বৃহৎ জমি ও যান্ত্রিকীকরণে, বাংলাদেশে সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে। আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশের আরেকটি শক্তি ছয় ঋতুর কৃষি। গ্রীষ্মের ফল, বর্ষার আমন ও জলজ সম্পদ, হেমন্তের ধান, শীতের সবজি এবং বসন্তের নতুন ফসল কৃষিকে বৈচিত্র্যময় করেছে। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের রূপান্তরও বিস্ময়কর। স্বাধীনতার শুরুতে ধান উৎপাদন ছিল প্রায় এক কোটি টনের কাছাকাছি; বর্তমানে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান উৎপাদনকারী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট চাল উৎপাদন চার কোটির বেশি টনে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের জন্য এফএওর পূর্বাভাসে মোট ধান উৎপাদন প্রায় ৬.২ কোটি টনে পৌঁছানোর কথা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২.৪ শতাংশ বেশি। উচ্চফলনশীল জাত, সেচ, গবেষণা ও কৃষকের অভিজ্ঞতা এই অগ্রগতির ভিত্তি।
আমেরিকার সুপারমার্কেটে খাদ্যের বিপুল প্রাচুর্য দেখেছি। কিন্তু দেশের কৃষির সাম্প্রতিক অগ্রগতি মনে করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশও খাদ্য বৈচিত্র্যের পথে এগোচ্ছে। গত কয়েক বছরে সবজি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী পাঁচ বছরে উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
ফল ও সবজি উৎপাদনে দেশীয় চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও বেড়েছে। বর্ষার জল, নদীর পলি, বিলের মাছ, শীতের সবজি, হেমন্তের ধান ও গ্রীষ্মের ফল আমাদের খাদ্যব্যবস্থাকে স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় করেছে। তবে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। এখন জরুরি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা। ডাল, তেলবীজ, দুধ, ডিম, মাছ, ফল ও সবজির ভারসাম্যপূর্ণ প্রাপ্যতার পাশাপাশি কীটনাশকের অপব্যবহার, ভেজাল, সংরক্ষণ ঘাটতি ও খাদ্য অপচয় কমাতে হবে। উৎপাদনের সাফল্য জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তায় রূপ না নিলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থাকবে।
পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার দেখে বুঝেছি, গবেষণা, কৃষি প্রকৌশল, খাদ্য প্রযুক্তি, তথ্যবিজ্ঞান ও শিল্পখাতের সংযোগ কীভাবে উদ্ভাবনকে দ্রুত মাঠে পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশেরও শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখছে। ধান গবেষণায় শতাধিক উন্নত জাত কৃষকের হাতে পৌঁছেছে।
সীমিত সম্পদের মধ্যেও আমাদের গবেষকেরা লবণসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু ও বন্যাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করেছেন। আমেরিকার গবেষণা প্রযুক্তির সীমা প্রসারিত করছে, বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান সহজ করছে। তবে গবেষণা থেকে শিল্পে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বাণিজ্যিকীকরণে আমরা এখনও পিছিয়ে। কৃষি গবেষণাকে স্টার্টআপ, খাদ্য শিল্প, কৃষিযন্ত্র, বীজ ব্যবসা ও ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কৃষি অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আর অবহেলার চোখে দেখার সুযোগ নেই। গ্রামের কৃষক এখন মোবাইলে আবহাওয়ার বার্তা, বাজারদর, কৃষি পরামর্শ ও আর্থিক সেবা পাচ্ছেন। মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন কৃষিসেবা, ড্রোনের প্রাথমিক ব্যবহার ও তথ্যনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনছে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই প্রযুক্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই বাংলাদেশের পুরোনো বাস্তবতা। লবণসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু ও বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাত, ভাসমান কৃষি, উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
সীমিত সম্পদের মধ্যেও অভিযোজনের যে সক্ষমতা আমরা দেখিয়েছি, সেটিই ভবিষ্যতের বড় শক্তি। এই শক্তির আরেকটি উজ্জ্বল দিক আমাদের মেধাবী সন্তানেরা। দেশের সীমানা পেরিয়ে তারা আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ঈর্ষণীয় স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও গবেষণার নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরুণ মেধার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আমাদের সন্তানরাও বিশ্বমানের জ্ঞান ও উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। কৃষকের মাঠ থেকে গবেষণাগার, মোবাইলের পর্দা থেকে আধুনিক প্রযুক্তি, আর বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এই মেধার অভিযাত্রাই আমাদের নতুন আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি রচনা করবে।
টরন্টো ও ভার্জিনিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বুঝেছি, বাংলাদেশ শুধু ভূখণ্ড নয়, স্মৃতি, ভাষা, খাদ্য ও পরিচয়ের এক বিস্তৃত জগৎ। প্রবাসী চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা রেমিট্যান্সের পাশাপাশি জ্ঞান, নেটওয়ার্ক ও আত্মবিশ্বাসও দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেন। ভার্জিনিয়ার এক বাড়ির আঙিনায় দেশি লাউয়ের মাচা দেখে মনে হয়েছিল, উন্নত দেশের মাটিতেও বাংলাদেশ তার শিকড় ধরে রাখে। তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কৃষকের ন্যায্যমূল্য, মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের দুর্বলতা, কৃষিজমি হ্রাস, মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়া এবং সেচের ওপর চাপ আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হবে তখনই, যখন কৃষকের আয় বাড়বে, ভোক্তা নিরাপদ খাদ্য পাবে এবং পরিবেশের ক্ষতি কমবে।
শিকাগোর নদীতীরে আধুনিক নগর পরিকল্পনা দেখে বাংলাদেশের নদীগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের নদী শুধু জলধারা নয়, কৃষি, খাদ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রাণরেখা। পদ্মার পাড়ের কৃষক, মেঘনার জেলে, যমুনার চর ও বিলের জল আমাদের ইতিহাসের অংশ। তাই নদী রক্ষা, জলাভূমি সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই নগরায়ণ ছাড়া ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিরাপদ হবে না। আমার কাছে বাংলাদেশের আগামী পথের তিনটি মূল শব্দ জ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিকতা। কৃষিতে গবেষণা বিনিয়োগ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণ, তরুণদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু সহিষ্ণু উন্নয়ন হতে পারে ভবিষ্যতের প্রধান স্তম্ভ।
আমেরিকার মহাসড়ক, গবেষণাগার, সুউচ্চ ভবন ও প্রযুক্তির দীপ্তি আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু সফরের শেষে মনে কোনো হীনম্মন্যতা জন্ম নেয়নি, বরং নিজের দেশের প্রতি অনুভব করেছি এক নতুন গর্ব। বুঝেছি, মানুষের উচ্চতা শুধু অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর শক্তিতে। যে দেশের কৃষক ক্ষুদ্র জমিতে কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দেন, যে দেশের মানুষ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পর আবার ঘর বাঁধেন, যে দেশের তরুণ প্রযুক্তিকে আপন করে নেন এবং গবেষক সীমিত সম্পদে জলবায়ু সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করেন, সেই দেশের সন্তান হওয়া নিঃসন্দেহে এক গভীর সৌভাগ্য।
“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে” তাই আমার কাছে শুধু একটি কবিতার পঙ্ক্তি নয়, আমেরিকা সফর শেষে ফিরে পাওয়া এক নতুন আত্মপরিচয়ের অনুভব। পথ দীর্ঘ, চ্যালেঞ্জও কম নয়। কিন্তু জ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিকতা যদি মাটির প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত হয়, কৃষকের শ্রম যদি যথাযথ মর্যাদা পায় এবং প্রকৃতি যদি উন্নয়নের অংশীদার হয়ে ওঠে, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে। বিদেশের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মনে পড়েছে নিজের দেশের আকাশ, বর্ষার মেঘ, শরতের কাশফুল, হেমন্তের ধান, শীতের কুয়াশা, বসন্তের পলাশ, নদীর ঢেউ আর মাটির সোঁদা গন্ধ। দূরদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও তখন হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসার এক অমোঘ উচ্চারণ ভেসে এসেছে, “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”
লেখক: কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
[email protected]
এইচআর/এএসএম
