সরকারি স্কুলে ভাড়াটিয়া শিক্ষক, নেপথ্যে শিক্ষক দম্পতির কোচিং বাণিজ্য
২৯৫ জন শিক্ষার্থীর বদলে শিক্ষক মাত্র দুজন। তাও আবার স্বামী-স্ত্রী। তারা শিক্ষক সংকটের দোহায় দিয়ে আরও দুইজনকে ভাড়া নিয়েছেন। শিক্ষক দম্পতি অলস বসে থাকেন। আর ভাড়াটিয়ারা পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে পরিচালনা করেন কোচিং-প্রাইভেট বাণিজ্য। সেজন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রতিমাসে দিতে হচ্ছে ৩০০ টাকা করে। এছাড়াও ভাড়াটিয়াদের যাতায়াতে মোটরসাইকেলের তেল বাবদ দিতে হয় আরও ২০ টাকা করে।
প্রায় দেড়মাস ধরে এমন গুরুতর অনিয়ম চলছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ৮৩ নম্বর চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অথচ এ বিষয়ে কিছুই জানে না শিক্ষা কর্মকর্তা। এতে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি উপজেলার পদ্মাপাড়ের দুর্গম এলাকা চরসাদিপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। সরেজমিন গিয়ে এমন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।
অথচ দারিদ্র্য দূরীকরণ, সকল শিশুর সমান অধিকার নিশ্চিত এবং দেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির লক্ষে ১৯৯০ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করেছেন সরকার।
জানা গেছে, উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর ওপারে উত্তর-পশ্চিম এলাকায় চরসাদিপুর ইউনিয়ন। সেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। উপজেলা ও জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র যানবাহন নৌকা।
আরও জানা গেছে, বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৯৫ জন। ৬ শিক্ষকের পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। তারা হলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হামিদ ও তার স্ত্রী সহকারী শিক্ষক গোলাপী পারভীন। শিক্ষক সংকটের দোহায় দিয়ে রিয়াদ হোসেন ও মো. আলামিন নামের দুইজনকে পাঠদানের জন্য ভাড়া করা হয়েছে। তারা শিক্ষক দম্পতির যোগসাজশে বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে কোচিং এবং প্রাইভেট বাণিজ্য করেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে প্রতিমাসে ৩০০ টাকা করে বেতন। এছাড়াও ভাড়াটিয়া শিক্ষকের যাতায়াতে মোটরসাইকেলের তেল বাবদ নেওয়া হচ্ছে আরও ২০ টাকা।
শিলাইদহ খেয়াঘাটে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পাওয়া গেল চরসাদিপুরে যাওয়ার নৌকা। প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার প্রমত্তা পদ্মা নদী পার হতে সময় লাগল ৩৩ মিনিট। দুর্গম চরে জরাজীর্ণ সড়কে মোটরসাইকেলে বিকেল ৩টা ৪ মিনিটে চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে দেখা গেল, বিদ্যালয়ের দুইটি কক্ষে চলছে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষা চলছে। চতুর্থ শ্রেণির কক্ষে রয়েছেন রিয়াদ হোসেন নামের এক যুবক এবং তৃতীয় শ্রেণির কক্ষে রয়েছেন ডেপুটেশনে থাকা শিক্ষক কামরুল হাসান। আর শিক্ষক দম্পতি বসে আসেন কার্যালয়ের কক্ষে। ওড়েনি জাতীয় পতাকাও।
এসময় রিয়াদ হোসেন বলেন, ‘এখানে টিচার (শিক্ষক) নাই। ১০-১৫ দিন ধরে আছি। শিক্ষকরা নিয়ে আসছেন। এখন ইংরেজি পরীক্ষা চলছে। আর আলামিন (ভাড়াটিয়া শিক্ষক) সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ফোর (চতুর্থ) ও ফাইভ (পঞ্চম) শ্রেণির প্রাইভেট পড়ান, কোচিং করান। তবে আমার সঙ্গে এখনো বেতন নিয়ে চুক্তি হয়নি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চুতর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘আমাদের ক্লাস শুরু হয় দেড়টায়। কিন্তু সাড়ে ১০টায় আসি। এসে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আলামিন স্যারের কাছে কোচিং করি। মাসে ৩০০ টাকা দিই। এক মাসের বেতন দিছি। আবার সামনে দেব।’
আরেক শিক্ষার্থী বললো, ‘আমি ফোরে পড়ি। সকালে থ্রি, ফোর ও ফাইভের কোচিং করান আলামিন স্যার, রিয়াদ স্যার, হামিদ স্যার ও গোলাপী ম্যাডাম। মাসে ৩০০ টাকা বেতন আর তেল খরচ ২০ টাকা দিই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার মেয়ে ফোরে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী মিলে দুজন বাইরের তে দুডি ছোয়াল আনেছে। জোর করে প্রাইভেট পড়ায়। না পড়লে স্কুলতে বাইর করে দেয়। এক মাসের বেতন ৩০০ টাকা দিছি।’
দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। স্যার ৩০০ টাকা চালো। আমি বলে কয়ে ২০০ টাকা দিছি। এরাম করে সরকারি স্কুলে টাকা নিলি ছোয়ালপাল পড়াবো ক্যাম্বো।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১৪ সাল থেকে স্বামী-স্ত্রী একই স্কুলে চাকরি করেন। বর্তমানে তারা ক্লাস নেন না। দুজন ভাড়াটিয়া দিয়ে বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে প্রাইভেট-কোচিং করান। ভয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা মুখ খুলতে পারেন না। সরকারি স্কুলে এমন অনিয়ম মানা যায়নি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
এ বিষয়ে ক্যামেরায় কথা বলতে চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সহকারী শিক্ষক গোলাপী পারভীন। পরে তিনি বলেন, ‘ওরা দুই সপ্তাহ হলো আমাদের হেল্প করছে। এখনো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি।’
এসময় তিনি অভিযোগকারী শিক্ষকদের নাম জানতে চান।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হামিদ বলেন, দুইজন শিক্ষক মিলে ২৯৫ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতে হিমসিম খাচ্ছি। আলামিন ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পড়ায়। টাকা তেমন নেওয়া হয় না। ছেলেপেলে খুশি হয়ে যা দেয়, তাই নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, শিক্ষক সংকটের কথা শিক্ষা কর্মকর্তাদের একাধিকবার বলা হয়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানালেন, বেতন নেওয়াতো দূরের কথা, পরীক্ষার ফি নেওয়াও গুরুতর অপরাধ। এমন অনিয়মে জড়ালে সাসপেন্ড হতে পারে। আবার চাকরিও চলে যেতে পারে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেতন দিয়ে পড়া লাগে না। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক বলে জানান উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুম মনিরা। তিনি বলেন, বিষয়টি আপনার মাধ্যমে এই প্রথম জানলাম। অবশ্যই বিধিমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আল-মামুন সাগর/এফএ/এএসএম
