ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল-বঙ্গভবন, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা
তাহমিদ হাসান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল তখন উত্তাল। ১৯৬৯ সাল, গণঅভ্যুত্থানের উত্তপ্ত দিনগুলো। মিছিলের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের একজন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক, পরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। নাম তার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক কারণে তখন তাকে যেতে হয়েছিল কারাগারেও। সে সময় কেউ হয়তো কল্পনাও করেনি, প্রায় ছয় দশক পর এই তরুণই হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান।
২০ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন অধ্যায়। জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হলেন আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যার উত্থান ছিল ছাত্র রাজনীতির উত্তপ্ত রাজপথে।
যে ছাত্রনেতার শুরু আন্দোলনে
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুলের পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, আর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার। বলা যায় রাজনীতি তার রক্তেই ছিল, কিন্তু নিজের পরিচয় তিনি গড়ে তুলেছিলেন ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়েই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার সময়কার সেই আন্দোলনমুখর দিনগুলো তার রাজনৈতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
শিক্ষকতা, বিসিএস ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা
স্বাধীনতার পর ছাত্র রাজনীতির অধ্যায় পেরিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। এই সরকারি কর্মজীবন তাকে একটি সুশৃঙ্খল, নীতিনির্ভর প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে, যা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনেও প্রতিফলিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
শিক্ষকতা থেকে রাজপথ
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে যোগ দেন মওলানা ভাসানীর ন্যাপে, সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালে নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন, ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন এবং ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন এবং ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নিযুক্ত হন এই দায়িত্বে তিনি দলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ছিলেন। রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে তিনি বারবার রাজপথে অগ্নিঝরা বক্তব্য দিয়ে দলকে সংগঠিত রেখেছেন, আবার প্রয়োজনে সংলাপের টেবিলেও নমনীয় ভূমিকা রেখেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘দ্য জেন্টলম্যান’ হিসেবে, কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ব্যক্তিগত সৌজন্য আর মার্জিত আচরণ বজায় রাখার এক বিরল রাজনৈতিক গুণের কারণে।
বিএনপির অন্যান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তুলনা
বিএনপি ঘরানা থেকে অতীতে জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার কিংবা ইয়াজউদ্দিন আহমেদের মতো ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন কেউ সামরিক পটভূমি থেকে, কেউ প্রশাসনিক বা বিচারবিভাগীয় অবস্থান থেকে। এদের তুলনায় মির্জা ফখরুলের পথটি ভিন্ন ও বহুমুখী।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়
বিসিএস ক্যাডার হিসেবে সরকারি কাঠামোর ভেতরের কাজ বোঝা, আবার মেয়র থেকে মহাসচিব পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির প্রতিটি স্তর অতিক্রম করা এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা অতীতের অনেক বিএনপি রাষ্ট্রপতির ছিল না।
তৃণমূল থেকে উঠে এসে সংকটকালীন নেতৃত্বের রেকর্ড
দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে নেতৃত্বশূন্যতা, মামলা-হামলা, রাজনৈতিক দমনপীড়নের মধ্যে তিনিই মহাসচিব হিসেবে দলকে সংগঠিত রেখেছেন, যা তাকে বিএনপির অভ্যন্তরে ও বাইরে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
মির্জা ফখরুলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রয়েছে আলাদা পরিচয়
আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে তার পরিচিতি তাকে নিছক ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদের বাইরে এক সাংস্কৃতিক-মানবিক পরিচয় দিয়েছে, যা রাষ্ট্রপতির মতো প্রতীকী পদের জন্য বাড়তি এক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। ক্লিন এক ইমেজ রয়েছে তার। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন কারণেই তিনি নেতাকর্মীদের কাছে আস্থাভাজন থেকেছেন যা বিএনপির কিছু অতীত নেতৃত্বের তুলনায় তাকে আলাদা করে।
এই কারণগুলোর সমন্বয়েই দলের সমর্থকরা মনে করেন, মির্জা ফখরুল কেবল একজন ‘মনোনীত’ রাষ্ট্রপতি নন, বরং একজন ‘অর্জিত’ রাষ্ট্রপতি, যিনি রাজপথ, প্রশাসন ও সংসদ, তিন ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রমাণ করে এসেছেন। এবার পালা রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে এগিয়ে রাখার।
তবে বিরোধী দল ও পর্যবেক্ষকদের একাংশ এই নির্বাচনকে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বাভাবিক ফল হিসেবে দেখছেন এবং প্রশ্ন তুলছেন যে, দলীয় মহাসচিব সরাসরি রাষ্ট্রপতি হওয়া রাষ্ট্রপতি পদের নিরপেক্ষতাকে কতটা প্রভাবিত করবে। যেমন বিরোধী প্রার্থী অলি আহমদের সমর্থকরা মনে করেন, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হওয়া প্রতীকী ভারসাম্যের প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ‘দ্য জেন্টেল ম্যান’ মির্জা ফখরুল কতটা সফল হবেন, তা নির্ভর করবে তিনি দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে কতটা সর্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন, তার ওপর আর সেই পরীক্ষার সবে শুরু হলো আজ থেকে…
লেখক: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
কেএসকে
