‘লাইব্রেরির বারান্দায় গিয়েছি, ভেতরে ঢোকার সাধ্য হয়নি’


“চার বছরে আমি লাইব্রেরির বারান্দায় গিয়েছি, কিন্তু লাইব্রেরির ভিতরে ঢোকার সাধ্য আমার হয়নি। ঢুকিনি বলতে আমি ঢুকতে পারিনি। তার মানে এই নয় যে আমার কোনো দরকার লাগেনি বা আমি পড়াশোনায় ভালো না। বিষয়টা হচ্ছে, আমি ঢুকতে পারিনি। ঢোকার মতো পরিবেশ আমার জন্য সেখানে ছিল না।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রিফাত রহমান এভাবেই তুলে ধরলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রবেশ করতে না পারার অভিজ্ঞতা। হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা এই শিক্ষার্থীর অভিযোগ, গ্রন্থাগারে প্রবেশের জন্য র‍্যাম্প বা লিফটের ব্যবস্থা না থাকায় চার বছরের ক্যাম্পাসজীবনে তিনি কখনো এর ভেতরে যেতে পারেননি।

রিফাত রহমান বলেন, “আমি একজন হুইলচেয়ার পারসন। হুইলচেয়ার পারসন হিসেবে আমার চার বছরের ক্যাম্পাস জার্নির সঙ্গে লাইব্রেরিও জড়িয়ে আছে।”

রিফাত বলেন, “দোতলায় ওঠার জন্য কোনো লিফট নাই বা কোনো র‍্যাম্প নাই। এছাড়া লাইব্রেরিতে পড়তে পড়তে যে ওয়াশরুম লাগবে, ওয়াশরুমের কোনো ব্যবস্থা নাই। সেক্ষেত্রে লাইব্রেরিতে ঢোকা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বিষয়টি কোনো অনুকম্পা বা করুণার বিষয় নয়; বরং এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার।”

“আমি এটা করুণা করে বলছি না। কারণ আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-তে আমাদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। যা লাইব্রেরিতে প্রবেশকেও বোঝায়। এটা কোনো করুণা নয়, এটা আইন দ্বারা কার্যত আমাদের অধিকার। আমাদের প্রতিনিয়ত এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে”, যোগ করেন রিফাত।

রিফাতের ভাষ্য, “আমাদের যে আইনটা আছে, প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইনে বলা আছে, সবার জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে বা সবাই যেন সমান অধিকার পায়, এটা নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা কিন্তু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কারণ লাইব্রেরিতে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা যারা আছে তারা যেতে পারছে, কিন্তু আমাদের মতো শিক্ষার্থীরা যেতে পারছে না। সেক্ষেত্রে আমরা কিন্তু পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়ছি।”

প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে রিফাত বলেন, “আমাদের লাইব্রেরিতে ঢোকার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের কাছে আমার দাবি থাকবে। এছাড়া, লাইব্রেরিতে আমাদের জন্য একটি ফ্লেক্সিবল ওয়াশরুমের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের লাইব্রেরিতে রিডিং রুম দোতলায়। সেখানে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। লিফট বা র‍্যাম্পের ব্যবস্থা করলে আমরা সেখানে যেতে পারব। আমাদের জন্য যতটুকু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা আইনে বলা আছে, সেটা যেন আমরা পাই। কারণ এটা আমাদের অধিকার। সেজন্য আমার দাবি, প্রশাসন যেন অতি দ্রুত এগুলো বাস্তবায়ন করে।”

শুধু রিফাত নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও গ্রন্থাগারকে প্রবেশগম্য করার দাবি উঠেছে। র‍্যাম্প, লিফট ও উপযোগী ওয়াশরুমের ব্যবস্থা করা হলে তারা অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো গ্রন্থাগারের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে আসেন। কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন, কেউ গবেষণার কাজে বই খোঁজেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় ধরে রিডিং রুমে পড়াশোনা করেন। কিন্তু, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অনেকের জন্য এই গ্রন্থাগার যেন প্রবেশের আগেই শেষ হয়ে যায়।

গ্রন্থাগারে প্রবেশের জন্য নেই র‍্যাম্প, দোতলায় ওঠার জন্য নেই লিফট। নেই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী ওয়াশরুমের ব্যবস্থাও। ফলে স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুবিধা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে।

প্রায় ছয় দশক আগে, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সাধারণ পাঠকক্ষ, দুটি ডিসকাশন রুম ও রেফারেন্স রুম মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক আসন রয়েছে বলে জানিয়েছেন লাইব্রেরি প্রশাসক। তবে, এসব পাঠকক্ষের কোথাও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ নেই।

বর্তমানে রাবিতে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে পড়াশোনা করছেন। হাত-পা, দৃষ্টিশক্তি কিংবা জন্মগত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে তারা অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো স্বাভাবিকভাবে ক্যাম্পাসের সব সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন না।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তাঁদের জন্য প্রবেশগম্যতা, পড়ার উপযোগী পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থা না থাকায় উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিতের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম হোসেন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ বছরে সবথেকে যে জিনিসটা আমাকে কষ্ট দিয়েছে তা হলো আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কোথাও আলাদা কোনো কর্নার নেই। লাইব্রেরিতে পড়ার কোনো পরিবেশ নেই। আমরা যে সেখানে যেয়ে পড়বো তেমন কোনো পরিবেশ নেই। প্রতিনিয়ত আমরা বঞ্চিত হচ্ছি এসব সুবিধা থেকে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল সিস্টেম থাকলেও আমাদের তা নেই। যার কারণে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা আমরা পাচ্ছি না। দীর্ঘদিন ধরে আমি একথা বলে আসছি। এগুলো পূরণ করা এখন সময়ের দাবি। আমি আশা করবো প্রশাসন দ্রুত এগুলো আমলে নিয়ে আমাদের দাবিগুলো পূরণ করবে। এবং আমরা যেন সমান সুযোগ পায় সেটা নিশ্চিত করবে।”

এ বিষয়ে রাকসুর সমাজকল্যাণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, “এ বিষয়ে আমি এর আগে অনেকবার ভিসি স্যারের সাথে কথা বলছি। গত দেড় মাস আগেও ভিসি স্যারের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করছি। উনি তখন বলছিলেন যে এক সপ্তাহের ভিতরে উনি এটার কাজ করে দিবে। তবে, এখনো কোনো কাজ দেখতে পায়নি আমরা। এছাড়া লাইব্রেরির জন্য শারীরিক অক্ষম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতির তালিকাও দিয়েছে। সেগুলোর বাজেটও হয়তো পাশ হয়েছে তবে এখনো সেগুলো কেনা হয়নি।”

তিনি আরো বলেন, “যেসব শিক্ষার্থী উপরে উঠতে পারবে না, যাদের পায়ের সমস্যা বা হুয়িলচেয়ার ব্যবহার করেন তাদের জন্য লিফট বা নিচতলায় ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছিলাম। উনারা বলছে যে সাত দিনের ভিতরে করে দিবে কিন্তু দেড় মাসের এখনো করে দেয়নি। লাইব্রেরিতে আমার কাছে মনে হয় যে অনেক জায়গা আছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, লাইব্রেরি প্রশাসক চাইলে আমি মনে করি যে এটা সম্ভব। উনাদের যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে এটা করতে পারবে।”

লাইব্রেরি প্রশাসক অধ্যাপক মেহা. হাবিবুল ইসলাম বলেন, “ওদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা প্রশাসনকে বিষয়টা জানিয়েছি। প্রশাসনও আন্তরিকভাবে বিষয়টা দেখছেন। হয়তো কয়েকদিনের ভেতরে আমরা এর একটা রেজাল্ট পেয়ে যাব। প্রশাসন অত্যন্ত পজিটিভলি কাজ করছে। আর আমি কোন দাবি দেওয়া পেলে সাথে সাথে প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করি। প্রশাসন বলে যে এটা আপনি নিয়ম অনুযায়ী পাঠান। আমরা দেখি।”

তিনি আরো বলেন, “বর্তমান প্রশাসন খুবই আন্তরিক। আমাদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের জন্য এটা খুব ভালো একটা পজিটিভ দিক। আমরা রেজাল্ট কয়েকদিনের ভেতরেই পেয়ে যাব। এছাড়া, বর্তমান যে লাইব্রেরি সিস্টেম আছে এই সিস্টেমে কিভাবে কি করলে ভালো হয় তা ইঞ্জিনিয়াররা ভালো বলতে পারবেন। আমরা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “এটা খুবই দুঃখজনক। তবে, ওদের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয়ে গেছে। কিছুদিন সময় লাগবে। একসাথে এত বেশি কাজে হাত দিয়েছি আমাকে সহযোগিতা করার মত সেই ধরনের কম্পিটেন্ট লোকেরও অভাব। আমি আশা করি খুবই অল্প সময়ের মধ্যে লাইব্রেরির কাজ আমরা শেষ করতে পারবো। শুধু লাইব্রেরি না প্রত্যেকটা জায়গায় ওয়াশরুমে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া লিফট, র‍্যাম্প যা লাগে তা ব্যবস্থা করা হবে।”





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *