হাই কোর্টে খালাস ১৬ বছরের বন্দি, জবানবন্দির ত্রুটিতে বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ


পিরোজপুরের দেড় দশক আগের একটি হত্যা মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করার সময় ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুসরণ না করায় সাবেক বিচারক মো. কবির উদ্দিন প্রামাণিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

মো. কবির উদ্দিন প্রামাণিক বর্তমানে আইন ও বিচার বিভাগের প্রশাসন-২ অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত। ঘটনার সময় তিনি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া চৌকি আদালতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।

হাই কোর্ট বলেছে, তার নথিবদ্ধ করা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আইনের বিধানবহির্ভূত এবং এটি তার ‘অযোগ্যতা ও পেশাগত অসদাচরণের’ প্রমাণ। গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচারে দায়রা ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তাকে ‘অযোগ্য’ বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আদালত।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ গত ২৭ জুলাই ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে এ রায় দেয়।

আদালতের নির্দেশে কবির উদ্দিন প্রামাণিককে সশরীরে হাজির করা হয়। তার নথিবদ্ধ করা জবানবন্দি এবং ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা দেখানোর পর আদালত এসব পর্যবেক্ষণ দেয়।

একই রায়ে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে ১৬ বছর ধরে কারাগারে থাকা নূর মোহাম্মদকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

হাই কোর্ট ঘটনার সময় প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী কবির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। এ জন্য রায়ের অনুলিপি এবং সংশ্লিষ্ট জবানবন্দির ফটোকপি মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কবির উদ্দিন প্রামাণিক গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি আপিল করব। যেহেতু রায়ে পর্যবেক্ষণ আছে, তাই আপিল তো করতেই হবে। রায়ের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা—সব মিলিয়ে উচ্চ আদালতে যেভাবে আপিল করতে হয়, সেভাবেই আমরা করব।”

তিনি আরও বলেন, “আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সম্ভবত এই সপ্তাহেই আপিল করে ফেলব।”

জবানবন্দি রেকর্ডে যেসব ত্রুটি

রায়ে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে নূর মোহাম্মদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করার সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার বাধ্যতামূলক বিধান অনুসরণ করা হয়নি।

আদালত দেখতে পায়, জবানবন্দির ফরমের ৫ নম্বর কলামে থাকা প্রশ্নগুলো আসামিকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর ৬ নম্বর কলামে তার উত্তর লিপিবদ্ধ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। সেখানে মাত্র তিনটি প্রশ্ন করা হয়েছিল।

এ ছাড়া জবানবন্দিটি সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য ৭ নম্বর কলামে প্রয়োজনীয় স্মারকলিপি বা তথ্য-প্রমাণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ৮ ও ৯ নম্বর কলামও ফাঁকা রাখা হয়। নির্ধারিত স্থানে আসামির স্বাক্ষর না নিয়ে অতিরিক্ত একটি পাতায় তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।

হাই কোর্ট বলেছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং এ ক্ষেত্রে ১৬৪ ধারার ২ ও ৩ উপধারার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

এসব বিধান অনুসরণ না করায় ওই জবানবন্দি আসামির বিরুদ্ধে দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য নয় বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচারকের বিষয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ

সশরীরে হাজির হওয়ার পর আদালত কবির উদ্দিন প্রামাণিকের সামনে ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার বিধান তুলে ধরে। আদালতের প্রশ্নের জবাবে তিনি কেবল বলেন, জবানবন্দির ফরমের ৮ ও ৯ নম্বর কলামে তিনি কিছু লেখেননি।

এর পর আদালত রায়ে বলে, “তার আচরণ ও ভঙ্গি থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, আজও তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করার গুরুত্ব বুঝতে পারেননি।”

আদালত আরও বলে, “তার নথিবদ্ধ করা জবানবন্দি আইনের বিধানের বাইরে গিয়ে করা হয়েছে, যা তার অযোগ্যতা ও পেশাগত অসদাচরণের প্রমাণ।”

রায়ে বলা হয়েছে, “সংশ্লিষ্ট সময়ে তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনের বিধান অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আদালত বা ট্রাইব্যুনালে পদায়ন করা হলে তিনি দায়রা ক্ষমতা প্রয়োগের দায়িত্ব পালনের জন্য অযোগ্য—আমরা তাকে এমনটাই মনে করি।”

একই সঙ্গে আদালত মৌখিকভাবে পরামর্শ দিয়েছে, আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো পড়ে যথাযথ জ্ঞান অর্জনের পর প্রতি মাসে একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে সেসব বিধান শেখানোর চেষ্টা করতে।

তবে রায়ে এও বলা হয়েছে, “কবির উদ্দিন প্রামাণিক নিজেই যদি আইনের এসব বিধান আত্মস্থ করতে না পারেন, তাহলে আদালতের দেওয়া ওই পরামর্শও নিষ্ফল হবে।”

মন্ত্রণালয়কে যে নির্দেশ

হাই কোর্ট কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি নির্ধারণ না করে তৎকালীন প্রযোজ্য আইনের অধীনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ ইজাজ কবির গণমাধ্যমকে বলেন, “রায় অনুযায়ী, যিনি স্বীকারোক্তি নথিবদ্ধ করেছেন, উনি ৩৬৪ এবং ১৬৪ ধারা অনুযায়ী তা নথিবদ্ধ করেন নাই। কলামগুলি উনি পূরণ করেন নাই এবং ওনাকে ডাকার পরে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন কোর্টের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে উনি ১৬৪ ধারার জবানবন্দির গুরুত্বটাই বুঝে উঠতে পারেন নাই বা পারছিলেন না।”

তিনি আরও বলেন, “কোর্ট বলেছেন যে, উনি এখন যে অবস্থানে আছেন, সেখান থেকে যেহেতু উনি জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করতে পারেন নাই, কোর্ট মনে করছে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেন, “হাই কোর্টের এই আদেশ নিছক কোনো পর্যবেক্ষণ নয়, এটি একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা, যা মানার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।”

তিনি বলেন, “নিম্ন আদালত এ ধরনের কোনো আদেশ দিলে তা মানার বাধ্যবাধকতা থাকে না, কিন্তু হাই কোর্টের সেই এখতিয়ার ও ক্ষমতা রয়েছে। অতীতেও অযোগ্যতার কারণে কোনো বিচারককে ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা’ না দেওয়ার নজির হাই কোর্টের রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “যেহেতু এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রায় এবং সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে এ কথা বলা হয়েছে, তাই সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই এই নির্দেশ মানা বাধ্যতামূলক।”

আপিলের সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মন্ত্রণালয়কে যেহেতু ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, তাই তারা যদি মনে করে আদেশটি সঠিক হয়নি, তবে এর বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। একইভাবে যার বিরুদ্ধে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সংক্ষুব্ধ হলে তিনিও আপিল বিভাগে যেতে পারেন।”

তার ভাষায়, “তবে আপিল না করা পর্যন্ত এই রায় মানার আইনি বাধ্যবাধকতা অবশ্যই আছে।”

আইনমন্ত্রী ও আইন সচিবের সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও বার্তা দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

যে কারণে বিচার ‘ত্রুটিপূর্ণ’

নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া প্রথম আইনজীবী দীর্ঘ সময় তার পক্ষে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে নতুন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার দিনই প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শুরু হয়। ফলে নতুন আইনজীবী প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পাননি।

এ ছাড়া আসামিকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর তথ্য থাকলেও তার মানসিক সুস্থতার কোনো প্রতিবেদন ছাড়াই বিচার এগিয়ে নেওয়া হয়।

এসব কারণে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছে হাই কোর্ট।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও চিকিৎসকের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে আদালত বলেছে, ভুক্তভোগীর জননাঙ্গে কিছু পরিবর্তন পাওয়া গেলেও তা ধর্ষণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

তবে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নূর মোহাম্মদই ভুক্তভোগীকে হত্যা করেছেন বলে আদালত মনে করেছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২১ মার্চ সকালে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া এলাকায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর লাশ বাড়ির পাশের খালপাড়ে পাওয়া যায়।

নিহতের মায়ের অভিযোগ ছিল, নূর মোহাম্মদ বাঁশ কাটার কথা বলে তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

ঘটনার ২৩ দিন পর স্থানীয় লোকজন নূর মোহাম্মদকে আটক করে পুলিশে দেয়। পরদিন তাকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কবির উদ্দিন প্রামাণিকের কাছে নেওয়া হলে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। তবে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেননি।

২০১৯ সালে পিরোজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল এবং ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে হাই কোর্ট মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে।

আদালত বলেছে, আইনের বিধান অনুসরণ করে নতুন করে বিচার চালানোর সুযোগ থাকলেও নূর মোহাম্মদ বিচারাধীন অবস্থায় নয় বছর এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেলে সাত বছরসহ মোট ১৬ বছর কারাভোগ করেছেন।

এই অবস্থায় নতুন করে বিচারের মুখোমুখি করা গুরুতর অবিচার হবে বলে আদালত মনে করেছে।

তাই ডেথ রেফারেন্স নাকচ করে তার আপিল মঞ্জুর এবং তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

তবে জবানবন্দিতে হত্যার কারণ এবং ট্রাইব্যুনালের নথিতে মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি উঠে আসায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে তার মানসিক পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষায় সুস্থ পাওয়া গেলে তাকে মুক্তি দিতে এবং অসুস্থ পাওয়া গেলে কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *