যে কনসার্ট দেখেছিলেন ১ কোটি ১৭ লাখ দর্শক
গর্ড ডাউনির শেষ কনসার্ট
২০১৬ সালের মে মাসে কানাডার ঐতিহ্যবাহী রক ব্যান্ড ‘দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপ’ তাদের বিদায়ী ট্যুর বা সফরের কথা প্রকাশ করে। মূলত ব্যান্ডের ১৩তম এবং সর্বশেষ অ্যালবাম ‘ম্যান মেশিন পোয়েম’-এর প্রচারণার অংশ হিসেবেই এই কনসার্ট সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে এই সফর ঘোষণার ঠিক আগের দিনই এক বেদনাদায়ক খবর সামনে আসে। ব্যান্ডের প্রধান গায়ক ও গীতিকার গর্ড ডাউনি জানতে পারেন, তিনি মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্যানসারে আক্রান্ত। পরবর্তীতে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর ক্যানসারটি ছিল নিরাময়-অযোগ্য। ক্যানসারের এই কঠিন লড়াইয়ের মাঝেই জীবনের শেষ সফরটি সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডাউনি।

শেষ কনসার্ট উপলক্ষ্যে জনসমুদ্রে পরিণত হয় কিংসটনের স্প্রিঙ্গার মার্কেট স্কয়ার। ছবি: রয়টার্স
‘ম্যান মেশিন পোয়েম ট্যুর’ নামে ১৫টি কনসার্টের সফর শুরু হয় ২২ জুলাই ভিক্টোরিয়া থেকে। এরপর কানাডার ১০টি শহরে কনসার্ট করে ব্যান্ডটি। সফরের শেষ আয়োজন ছিল ২০ আগস্ট ডাউনির নিজের শহর কিংস্টন, অন্টারিওর রজার্স কে-রক সেন্টারে। কনসার্টের টিকিট বিক্রি হয়ে যায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই।
শেষ কনসার্টটি সরাসরি সম্প্রচার করে কানাডার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি। টেলিভিশন ও রেডিওর পাশাপাশি সিবিসির ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ইউটিউব ও ফেসবুকেও অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখানো হয়। সব মাধ্যম মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ মানুষ অনুষ্ঠানটি দেখেন ও শোনেন। শুধু টেলিভিশনেই গড়ে দর্শক ছিল প্রায় ৪০ লাখ।
কানাডার অন্যতম বড় টেলিভিশন দর্শকসংখ্যার ঘটনাও হয়ে ওঠে এটি। এর চেয়ে বেশি দর্শক পেয়েছিল ২০১০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কানাডার পুরুষ হকি দলের স্বর্ণপদক জয়ের ম্যাচ। সেটি দেখেছিলেন ১ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। ২০০২ সালের অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কানাডার আরেকটি হকি ম্যাচ দেখেছিলেন ১ কোটি ৫ লাখ দর্শক।
কনসার্টটি শুধু টেলিভিশনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কানাডার বিভিন্ন শহরে আয়োজন করা হয়েছিল সরাসরি প্রদর্শনের। ব্যান্ডটির নিজের শহর কিংস্টনে প্রায় ২২ হাজার মানুষ একসঙ্গে বড় পর্দায় কনসার্টটি দেখেন। পুরো দেশের বিভিন্ন স্থানেও হয়েছিল এমন আয়োজন।

দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে ৩ বার বাড়তি পরিবেশনাসহ টানা তিন ঘণ্টা গান গায় ব্যান্ডটি। ছবি: রয়টার্স
প্রায় তিন ঘণ্টার কনসার্টে ডাউনির সঙ্গে ছিলেন গিটারিস্ট পল ল্যাংলোয়া, রব বেকার, বেজিস্ট গর্ড সিনক্লেয়ার ও ড্রামার জনি ফে। ১৯৮০-এর দশকে যাত্রা শুরু করা ‘দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপ’ মূলত কানাডাতেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৪টি অ্যালবাম নিয়ে সংগীতজীবনে তারা কানাডার সংগীতাঙ্গনে নিজেদের আলাদা জায়গা তৈরি করে।
ব্যান্ডটির গানের কথায় কানাডার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দেশটির মানুষের নানা অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। এ কারণে ‘দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপ’ শুধু একটি জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ছিল না, অনেক কানাডীয়র কাছে তারা জাতীয় পরিচয়েরও একটি অংশ হয়ে উঠেছিল। কানাডার বাইরে তাদের জনপ্রিয়তা তুলনামূলক কম হলেও নিজেদের দেশে ব্যান্ডটির প্রভাব ছিল অনেক বেশি।

শুধু টেলিভিশনেই গড়ে দর্শক ছিল প্রায় ৪০ লাখ। ছবি: রয়টার্স
শেষ কনসার্টের পরও ডাউনি সংগীত ও অন্যান্য কাজ চালিয়ে যান। তিনি ‘দ্য সিক্রেট পাথ’ নামে একটি একক অ্যালবাম ও গ্রাফিক নভেল নিয়েও কাজ করেন।
তবে শেষ কনসার্টের পর বেশি দিন বাঁচেননি ডাউনি। ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর ৫৩ বছর বয়সে মস্তিষ্কের ক্যানসারে মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর ‘দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপ’ আর নতুন কোনো কনসার্টে পারফর্ম করেনি। ফলে ২০ আগস্ট ২০১৬-এর কিংস্টনের আয়োজনটিই ব্যান্ডটির শেষ কনসার্ট হিসেবে থেকে যায়।

ডাউনির মৃত্যুর পরও ‘দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপ’–এর জনপ্রিয়তা কমেনি। ছবি: রয়টার্স
ডাউনির মৃত্যুর পরও ‘দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপ’–এর জনপ্রিয়তা কমেনি। তাদের ‘ইয়ার ফেভারিটস’ অ্যালবাম সম্প্রতি বিলবোর্ড কানাডিয়ান অ্যালবামস চার্টে ৪০০ সপ্তাহ পূর্ণ করেছে। অ্যালবামটি ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল এবং এতে ব্যান্ডটির ৩০টির বেশি জনপ্রিয় গান রয়েছে। অ্যালবামটি একসময় চার্টের শীর্ষেও উঠেছিল।
ব্যান্ডটির মোট ২০টি অ্যালবাম বিলবোর্ড কানাডিয়ান অ্যালবামস চার্টে জায়গা পেয়েছে। এই সংখ্যায় তারা কানাডার শিল্পীদের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। তাদের সাতটি অ্যালবাম চার্টের শীর্ষে উঠেছে।
শেষ কনসার্টের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামীকাল ২২ আগস্ট সিবিসি আবার পুরো কনসার্টটি সম্প্রচার করবে। একই সময়ে কানাডার বিভিন্ন স্থানেও কনসার্টটির প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে। এক দশক পরও গর্ড ডাউনির শেষ মঞ্চ এবং দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপের সংগীত যে কানাডীয়দের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, এ আয়োজন তারই আরেকটি প্রমাণ।
সূত্র: বিবিসি, সিবিসি, বিলবোর্ড কানাডা ও টরন্টো সান।
বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি
