সাদা-কালো বাক্সে হাজার তথ্য, কিউআর কোড কীভাবে কাজ করে জানেন?
দোকানে পেমেন্ট, রেস্তোরাঁর মেনু দেখা, ওয়েবসাইট খোলা কিংবা কোনো পণ্যের বিস্তারিত তথ্য জানা প্রতিদিনের নানা কাজে কিউআর কোড এখন আমাদের সঙ্গী। ফোনের ক্যামেরা দিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্ক্যান করলেই প্রয়োজনীয় তথ্য সামনে চলে আসে। দেখতে অবশ্য মনে হয়, ছোট ছোট কালো-সাদা ঘরের সমষ্টি। কিন্তু এই সামান্য জায়গার মধ্যেই কীভাবে এত তথ্য রাখা সম্ভব? এর পেছনে রয়েছে বেশ চমকপ্রদ একটি ডিজিটাল প্রযুক্তি।
কিউআর কোড কী?
কিউআর কোডের পূর্ণরূপ কুইক রেসপন্স কোড। এটি মূলত দ্বিমাত্রিক বা ২ডি বারকোডের একটি ধরন। প্রচলিত বারকোডে যেখানে মূলত একদিকে তথ্য সাজানো হয়, কিউআর কোডে তথ্য দুই দিকেই আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে সংরক্ষণ করা যায়। এই কারণেই একই জায়গার মধ্যে সাধারণ বারকোডের তুলনায় অনেক বেশি ডেটা রাখা সম্ভব হয়। কিউআর কোডের কালো ও সাদা ছোট ছোট ঘরগুলোকে বলা হয় মডিউল। এই মডিউলগুলোর নির্দিষ্ট বিন্যাসের মধ্যেই ডিজিটাল তথ্য প্রকাশ পায়।
কোডের প্রতিটি অংশের রয়েছে আলাদা কাজ
কিউআর কোডের পুরো নকশাটি এলোমেলো নয়। এর বিভিন্ন অংশ স্ক্যান করার সময় আলাদা আলাদা ভূমিকা পালন করে।কোডের তিনটি কোণে থাকা বড় বর্গাকার চিহ্নগুলোকে বলা হয় পজিশন মার্কার। স্মার্টফোনের ক্যামেরা বা স্ক্যানার এই চিহ্নগুলোর সাহায্যে কিউআর কোডের অবস্থান ও দিক শনাক্ত করতে পারে। ফলে কোডটি উল্টো, বাঁকা কিংবা কিছুটা কাত হয়ে থাকলেও সেটিকে সঠিকভাবে পড়া সম্ভব হয়।
এছাড়া রয়েছে টাইমিং প্যাটার্ন, যা কিউআর কোডের ছোট মডিউলগুলোর অবস্থান এবং তাদের মধ্যকার বিন্যাস বুঝতে স্ক্যানারকে সহায়তা করে। আর যে অংশটিতে মূল তথ্য সংরক্ষিত থাকে সেটি হলো ডাটা এরিয়া। কোনো ওয়েবসাইটের লিংক, লেখা, পেমেন্ট সংক্রান্ত তথ্য কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল ডাটা এখানে রাখা যেতে পারে।
কালো-সাদা ঘরে কীভাবে তথ্য ঢোকে?
এখানেই রয়েছে কিউআর কোডের আসল প্রযুক্তি। কোনো লেখা বা লিংককে সরাসরি ছোট ছোট কালো-সাদা ঘরে বসিয়ে দেওয়া হয় না। প্রথমে সেই তথ্যকে নির্দিষ্ট ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর করা হয়। কম্পিউটার ডাটাকে মূলত বাইনারি পদ্ধতিতে অর্থাৎ ০ এবং ১ হিসেবে প্রক্রিয়া করে। কিউআর কোড তৈরির সময় এই ডেটাকে নির্দিষ্ট নিয়মে সাজিয়ে কালো ও সাদা মডিউলের প্যাটার্নে রূপ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, চোখে যে অসংখ্য ছোট বক্স দেখা যায়, সেগুলো আসলে ডিজিটাল তথ্যের একটি বিশেষ সাংকেতিক বিন্যাস।
ফোন কীভাবে কিউআর কোড পড়ে?
স্মার্টফোন দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করার সময় ক্যামেরা প্রথমে পুরো কোডটির ছবি নেয়। এরপর সফটওয়্যার কোডের বিভিন্ন চিহ্ন শনাক্ত করে তার অবস্থান, দিক এবং মডিউলের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে। এরপর কালো-সাদা প্যাটার্ন থেকে বাইনারি ডেটা উদ্ধার করা হয়। সেই ডেটাকে আবার ব্যবহারযোগ্য তথ্যে রূপান্তর করে ফোনের স্ক্রিনে দেখানো হয়। তাই একটি কিউআর কোড স্ক্যান করে ওয়েবসাইট খুলে গেলে আসলে কয়েকটি ধাপে কাজটি সম্পন্ন হয় ক্যামেরায় কোড ধরা, প্যাটার্ন শনাক্ত করা, ডেটা ডিকোড করা এবং শেষ পর্যন্ত সেই তথ্য ব্যবহারকারীর সামনে তুলে ধরা।
কোডের কিছু অংশ নষ্ট হলেও কেন কাজ করে?
কিউআর কোডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো ইরোর কারেকশন। এর ফলে কোডের একটি অংশ দাগ পড়ে গেলে, ছিঁড়ে গেলে বা সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেটি স্ক্যান করা সম্ভব হয়। কিউআর কোড তৈরির সময় মূল ডাটার পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত তথ্যও রাখা হয়। স্ক্যান করার সময় কোডের কোনো অংশ থেকে তথ্য পাওয়া না গেলে এই অতিরিক্ত ডাটার সাহায্যে হারানো অংশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা যায়। তবে কতটা ক্ষতি হলেও কিউআর কোড কাজ করবে, তা নির্ভর করে ব্যবহৃত ইরোর কারেকশনের মাত্রার ওপর।
কতটা তথ্য রাখা যায়?
কিউআর কোডের ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট একটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। কোডের আকার, ডাটার ধরন এবং ব্যবহৃত সেটিংসের ওপর এর ধারণক্ষমতা নির্ভর করে। সর্বোচ্চ আকারের কিউআর কোডে প্রায় ৭ হাজার সংখ্যাসূচক অক্ষর রাখা সম্ভব। আর অক্ষর, সংখ্যা ও বিভিন্ন চিহ্নের সমন্বয়ে প্রায় ৪ হাজারের কাছাকাছি ক্যারেক্টার সংরক্ষণ করা যায়। তবে ডাটার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিউআর কোডের আকারও বড় এবং প্যাটার্ন আরও ঘন হয়ে যায়।
কোথায় কোথায় ব্যবহার হয়?
বর্তমানে কিউআর কোডের ব্যবহার শুধু ওয়েবসাইটের লিংকে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দোকান বা রেস্তোরাঁয় পেমেন্টের পাশাপাশি খাবারের মেনু দেখতেও কিউআর কোড দেখা যায়।
এ ছাড়া পণ্যের প্যাকেট, বিজনেস কার্ড, পোস্টার, ব্রোশিওর, ইভেন্টের টিকিট এবং বিভিন্ন প্রচারমূলক উপকরণেও এটি ব্যবহার করা হয়। কোনো ভিডিও, ওয়েবপেজ বা অনলাইন পরিষেবায় দ্রুত পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবেও কিউআর কোড বেশ কার্যকর।
এমনকি ওয়াই-ফাইয়ের নাম ও পাসওয়ার্ড শেয়ার করার ক্ষেত্রেও কিউআর কোড ব্যবহার করা যায়। ফলে একটি ছোট্ট কালো-সাদা নকশা দেখতে সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে তথ্যকে সংকেত আকারে সাজানো এবং মুহূর্তে তা পড়ে ফেলার বেশ উন্নত প্রযুক্তি।
কেএসকে
