সংসদে হাসনাতের বক্তব্য ঘিরে মধ্যরাতে উত্তাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা বন্ধের ঘটনা নিয়ে জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে জেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। একই সঙ্গে হাসনাতকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় শহরের শিল্পকলা একাডেমিতে এনসিপির শনিবারের কর্মসূচি বয়কট ও প্রতিহত করা হবে বলে ঘোষণাও এসেছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের জামিয়া ইউনূছিয়া মাদ্রাসা থেকে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্যোগে একটি মিছিল বের হয়। এতে কয়েক শ শিক্ষার্থী অংশ নেন। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের সমালোচনা করেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং বক্তব্যের জন্য তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতাকর্মীরা বলেন, ‘হুজুরদের দোষারোপের সেই পুরোনো সংস্কৃতি আর নয়।’ আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন ঘটনায় যেভাবে হুজুরদের দোষারোপ করা হতো, এখনও যেন সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না হয়।
তারা আরও বলেন, পুলিশ লাইনে উচ্চ শব্দে গান-বাজনাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনায় মিথ্যাচার যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি নৌকাবাইচ বন্ধের ঘটনায় সংসদে হাসনাত আব্দুল্লাহ যেভাবে তাওহিদি জনতাকে দোষারোপ করেছেন, সেটিও অন্যায়।
এসময় তারা হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। অন্যথায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া এনসিপির কর্মসূচি বয়কট ও প্রতিহত করা হবে বলে ঘোষণা দেন।
বিক্ষোভের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও এনসিপিকে বয়কট ও প্রতিহতের ঘোষণার বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে।
মুহাম্মদ হারুনুর রশিদ মিসবাহ্, ফেসবুক আইডির তথ্য অনুযায়ী যিনি জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও পত্তন ইউপি ছাত্র উলামা পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক, তিনি লেখেন, “ছাত্র সমাজ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহর মিথ্যাচারের প্রতিবাদে ৩ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হলো- ১. ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে বক্তব্যের জন্য আজ রাতেই হাসনাতকে ক্ষমা চাইতে হবে। ২. সংসদে দাঁড়িয়ে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। ৩. দাবি না মানলে আগামীকাল (শনিবার) এনসিপির কর্মসূচি প্রতিহত করা হবে। আহ্বানেঃ কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া।”
মনিরুজ্জামান আল জামী নামে এক খতিব তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ‘এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে যেই বক্তব্য দিয়েছেন! তাতে সবাই ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ হয়েছেন! এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ক্ষমা না চেয়ে আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংগঠনিক সমন্বয় সভার আয়োজন করা মানে উপরে পড়ে ঝগড়া করার নামান্তর! ভাতিজারা আগে বিষয়টি সমাধান করো! পরে সভা করো!’
পাশাপাশি তিনি বয়কট এনসিপি ফটোকার্ডও শেয়ার করেছেন।
ফখরুল ইসলাম নিজামপুরী নামে আরেকজন খতিব ফেসবুকে লেখেন, ‘হাসনাত আব্দুল্লাহ সে দিন কী হয়েছিল এ বিষয়ে বিস্তারিত না জেনে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। আমি এনসিপির সকল দায়িত্বশীলদের উদ্দেশ্যে বলবো, হাসনাত আব্দুল্লাহকে তার বক্তব্যের জন্য জবাবদিহিতা করতে বাধ্য করবেন।’ পাশাপাশি এ বিষয়ে তিনি ভিডিও বার্তাও দেন।
এসব পোস্টে সহমত পোষণ করে হাজার হাজার লাইক ও কমেন্ট দেখা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে এক সম্পূরক প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সাংস্কৃতিক জেলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেখানে গান-বাজনা ও সিনেমা বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হাসনাত জানতে চান, ‘এই ছয় মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন কি না? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না, নাকি তিনি ব্যর্থ হয়েছেন?’
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফেসবুকে এর প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্টও করেন। এরইমধ্যে শুক্রবার রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কওমি শিক্ষার্থীরা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেল ৪টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিল্পকলা একাডেমিতে এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা রয়েছে। এতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই জেলায় হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে কওমি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও এনসিপির কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণা ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে। শনিবার সকাল পর্যন্ত এনসিপির কোনো নেতাকে এ বিষয়ে কথা বলতে দেখা যায়নি। হাসনাত আব্দুল্লাহরও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের প্রতিবাদে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আগামীকালের এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রোহান/সা.এ.
