ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কেন যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হাঁটা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরসাইল মিলে ইরানের ওপর অভিযান শুরু করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর দুই দফায় ৪০ দিন যুদ্ধ চলে। এ যুদ্ধে সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র এবং শক্তিধর ইসরাইল মিলে ৪৭ বছর ধরে নানা অবরোধের মধ্যে থাকা ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে দেশটির ওপর হাজার হাজার বোমা বর্ষণ করে। এতে ইরানের সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীসহ উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করেছে কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য সাধন হয়নি। সেখানে সরকার পরিবর্তন হয়নি, পরমাণু স্থাপন ধ্বংস হয়নি, পরমাণু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের দখলে নিতে পারেনি। আর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো তছনছ করে দিয়েছে। এ সব ঘাঁটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সেখান থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের এ পর্যায়ে এসে ইরানের ওপর আর হামলা চালানোর ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেই। তার পিছু হেঁটেছে। কিন্তু কেন তাদের হাঁটা?
ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সরাসরি সামরিক যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু গুরুতর সামরিক সীমাবদ্ধতা ও কৌশলগত দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোলাবারুদ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধাস্ত্রের মজুদ মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে এসেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পেন্টাগনের এই যুদ্ধাস্ত্রের মজুদ আবার যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে।
ইরান যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনকে চীনের মতো অন্যান্য প্রধান বৈশ্বিক প্রতিপক্ষদের মোকাবেলা করার ক্ষেত্র থেকে তাদের কৌশলগত সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে বাধ্য হতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পেন্টাগন জাপান থেকে তাদের অন্যতম প্রধান বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পারস্য উপসাগরে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে, যাতে দীর্ঘ মাস ধরে সাগরে মোতায়েন থাকা ক্লান্ত ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন রণতরী ও তার নাবিকদের স্বস্তি দেওয়া যায়।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলো— যার মধ্যে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরও রয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা ব্যবহারের জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। ফলে সরবরাহ নিশ্চিত করতে মার্কিন জাহাজগুলোকে শত শত কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন চার তারকা জেনারেল ব্যারি আর ম্যাকক্যাফ্রে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী পারস্য উপসাগরের অন্তত ১৫টি সামরিক ঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে প্রবেশাধিকার হারিয়েছে।
মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফির মতে, আমেরিকার সামরিক অভিযান সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর আগের চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ওই অঞ্চলে তাদের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি পুরোপুরি অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সর্বাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও এই দীর্ঘ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের চূড়ান্ত সামরিক বা কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারেনি। ওয়াশিংটন সামরিক শক্তির মাধ্যমে তেহরানকে আত্মসমর্পণ করাতে বা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আর এই সামরিক সীমাবদ্ধতার কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিষেধাজ্ঞার মতো অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে ঝুঁকেছে।
ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এবং নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে মার্কিন জনসাধারণের মতামতের গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধনীতি ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলছে।
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘায়িত সামরিক অভিযান সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক একটি রয়টার্স/ইপসোস জনমত জরিপ অনুসারে, মাত্র ৩১ শতাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। যুদ্ধের এই নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর পড়েছে, যার ফলে তাঁর নিজের জনপ্রিয়তার হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। মার্কিন জনসাধারণের এই বিপুল অসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
কয়েক মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মার্কিন ভোটারদের এই অসন্তোষজনক মনোভাবের বিষয়টি তেহরানের নেতারা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হিসাব কষছে যে নির্বাচনের এই সংবেদনশীল সময়ে মার্কিন জনসাধারণের তীব্র আপত্তির কারণে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে আর কোনো বড় সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি নেবে না। ফলে ইরান আমেরিকার সাথে কোনো আপস না করে চরম অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করেই পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়েছে, যাতে ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত একটি সম্মানজনক প্রস্তাব দিতে বাধ্য হয়।
ইরান কর্তৃক কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল অবরুদ্ধ করার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ মার্কিন ভোক্তারা পেট্রোল পাম্পে যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই সরাসরি পকেট কাটার প্রভাব মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচনের মাঠে ট্রাম্পের দলের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মার্কিন জনসাধারণের এই ভোগান্তি নিয়ে ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস মারফি স্পষ্ট ভাষায় ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেছেন, ইরান এই যুদ্ধে জিতছে, ট্রাম্প হারছেন এবং সাধারণ আমেরিকানদের এর জন্য বিশাল মূল্য দিতে হচ্ছে। তিনি এই সামরিক ব্যর্থতা ঢাকতে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাকে মূলত একটি ‘লোকদেখানো ভাঁওতাবাজি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন জনসাধারণের ক্ষোভ, তেলের নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন— এই বিষয়গুলো ট্রাম্প প্রশাসনের হাতকে অনেকটাই বেঁধে ফেলেছে এবং ইরানকে এই অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা দিচ্ছে।
