ইসলামে ‘প্রজ্ঞা’ অর্জনের ৩টি সহজ ধাপ


অনেকেই ভবিষ্যত নিয়ে সবসময় অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন। অর্থনৈতিক টানাটানি রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। ভালো কাজ করতে গেলে অলসতা ধরে আর মন্দ কাজের দিকে মন টানে।

এসবই সংকেত দেয় যে আমাদের চিন্তার জগতকে শয়তান কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে।

ক্যারিয়ারের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, সম্পর্কের টানাপোড়েন সামলানো কিংবা প্রলোভনের মুখে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই ভুল করে বসি।

জীবনদর্শনের ভাষায় ‘প্রজ্ঞা’ (উইজডম/হিকমা) হলো জীবনের সঠিক ও কল্যাণকর সিদ্ধান্ত বেছে নেওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা।

প্রজ্ঞা লাভের প্রথম শর্তই হলো হৃদয়কে পাপাচারের ময়লা থেকে মুক্ত করা। মানুষ যখন কোনো অপরাধ বা পাপে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার অন্তরে এক ধরনের কালচে দাগ পড়ে যায়।

প্রজ্ঞা হারিয়ে ফেলা মানুষের বিবেককে শয়তান সহজেই ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে। শয়তান মানুষের খারাপ ও ক্ষতিকর সিদ্ধান্তগুলো তার সামনে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে। (সুরা নাহল, আয়াত: ৬৩)

এই শয়তানি বিভ্রান্তি কাটিয়ে নিজের মন ও বুদ্ধির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার এবং ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা অর্জনের ৩টি কার্যকর ধাপ নিয়ে এই আলোচনা।

প্রথম ধাপ: তওবায় মন পরিষ্কার করা

প্রজ্ঞা লাভের প্রথম শর্তই হলো হৃদয়কে পাপাচারের ময়লা থেকে মুক্ত করা। মানুষ যখন কোনো অপরাধ বা পাপে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার অন্তরে এক ধরনের কালচে দাগ পড়ে যায়।

পাপের পরিমাণ যত বাড়ে, সেই কালচে দাগ তত বড় হয়ে পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলে। এর ফলে মানুষের ভালো-মন্দের তফাত করার ক্ষমতা বা প্রজ্ঞা নষ্ট হয়ে যায়।

মহানবী (সা.) এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, “যখন কোনো মুমিন বান্দা পাপ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। কিন্তু সে যদি তওবা করে, পাপ ছেড়ে দেয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তবে তার অন্তর আবার চকচকে ও পরিষ্কার হয়ে যায়। আর সে যদি পাপ বাড়িয়ে দেয়, তবে সেই কালো দাগও বাড়তে থাকে। এটিই হলো সেই ‘রান’ বা অন্তরের মরিচা, যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে (সুরা মুতাফফিফিন: ১৪) উল্লেখ করেছেন, ‘কখনই নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা বা জং ধরিয়ে দিয়েছে’।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৪৪)

খাঁটি তওবা মানুষের হৃদয়কে পুনরায় স্বচ্ছ করে তোলে, যার ফলে বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞা উন্মুক্ত হয়।

দ্বিতীয় ধাপ: পাপ বর্জন ও আল্লাহর স্মরণ

অন্তর পরিষ্কার করার পর দ্বিতীয় কাজ হলো সেই পরিচ্ছন্ন মনকে শয়তানের নিত্যনতুন আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। প্রতিটি পাপ হলো আমাদের চিন্তার জগতে শয়তানের প্রবেশের এক একটি খোলা দরজা।

তাই পাপের সব দুয়ার বন্ধ রাখাই হলো সুরক্ষার প্রথম কৌশল। হঠাৎ কোনো ভুল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে মন ধুয়ে ফেলতে হবে।

মনকে সুরক্ষিত রাখার দ্বিতীয় শক্তিশালী অস্ত্র হলো সকাল-সন্ধ্যার জিকির–আজকার। মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার (একটি দোয়া) বলবে, তবে কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৮)

দোয়াটি হলো, ‘বিসমিল্লাহিল লাযী লা ইয়াদুররু মা‘আস মিহী শাইউন ফিল আরদ্বি ওয়া লা ফিস সামা-ই ওয়া হু ওয়াস সামী‘উল ‘আলীম’।

অর্থ: পরম আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না; এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ)—

প্রতিদিন নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের চর্চা মানুষের চারপাশে সুরক্ষার এক অদৃশ্য দুর্গ তৈরি করে দেয়।

তৃতীয় ধাপ: গভীর ভাবনা ও তাফাক্কুর

সাধারণত চুপচাপ বসে চিন্তা করাকে অলসতা বা অপচয় মনে করা হয়। অথচ সামাজিকমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস বা ভিডিও দেখে সময় কাটানো মানুষকে মিথ্যা কর্মব্যস্ততার তৃপ্তি দেয়।

ইসলামি জীবন দর্শনে এই ধারণাকে বদলে দিয়ে ‘উৎপাদনশীল নীরবতা’ বা গভীর ভাবনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ও নিজের জীবনের ভুলত্রুটি নিয়ে নির্জনে চিন্তা করার নামই হলো ‘তাফাক্কুর’।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানের জনপ্রিয় থেরাপি ‘কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি’র মূল ভিত্তি হলো নিজের চিন্তা ও অনুভূতির ওপর গভীর নজর রাখা ও আত্মপর্যালোচনা করা।

আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনাবলি স্পষ্ট করে বর্ণন করেন, যাতে তোমরা গভীরভাবে চিন্তা করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৯)

ইসলামি জীবন দর্শনে ‘উৎপাদনশীল নীরবতা’ বা গভীর ভাবনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ও নিজের জীবনের ভুলত্রুটি নিয়ে নির্জনে চিন্তা করার নামই হলো ‘তাফাক্কুর’।

মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন; আর যাকে প্রজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাকে মূলত অসীম কল্যাণ দান করা হয়েছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৯)

কোরআনে এই প্রজ্ঞাবান মানুষদের ‘উলুল আলবাব’ (বিবেচনাবোধসম্পন্ন) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, “যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে আর বলে, হে আমাদের প্রতিপালক আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি, আপনি মহা পবিত্র; আমাদের দোজখের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০-১৯১)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *