উপকূলের লবণাক্ত খাবার পানিতে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে: গবেষণা
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে, যা ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ােচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত এনআইএইচআর গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় খুলনার কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার খাবার পানির উৎসগুলোর বড় একটি অংশে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। একই এলাকার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আগামী ১০ বছরে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সোমবার (২৪ সোমবার) মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ‘পানীয় জলের লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশের প্রমাণ ও নীতিগত সুপারিশ’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার এসব প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সহযোগিতায় সেমিনারটির আয়োজন করে আইসিডিডিআর,বি।
গবেষণার বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আলিয়া নাহিদ।
তিনি জানান, এনআইএইচআর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ কর্মসূচির আওতায় কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামে খাবার পানির উৎসের লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকেরা মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। খাবার পানির উৎসের মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, “উপকূলীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পানিই এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। খাবার পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গর্ভবতী নারীরাও এ কারণে বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।”
গবেষণার আরেকটি অংশে কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জনের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। এতে প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন, অর্থাৎ ২১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে পানি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত কর্মসূচি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার ও টিউবওয়েল ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানির উৎসের ডিজিটাল নিবন্ধন এবং নিয়মিত নজরদারির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি সচেতনতা, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপে সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, “খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারিত হয়নি। পানিতে থাকা সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।”
অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলের পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে দীর্ঘস্থায়ী লবণাক্ততা তৈরি হতে পারে। এ জন্য জলোচ্ছ্বাসের পর পানির উৎস দ্রুত পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার এবং উপকূলীয় বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।”
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশে তথ্য-প্রমাণ এখনো সীমিত। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণকে একসঙ্গে যুক্ত করে বাস্তবসম্মত সমাধান পরীক্ষা করা হচ্ছে।”
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, “উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য লবণাক্ততা ইতোমধ্যেই বড় স্বাস্থ্যসমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এর মাত্রা আরো বাড়তে পারে। এ ধরনের গবেষণা জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ।”
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, “খাবার পানির লবণাক্ততা যদি উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যায় ভূমিকা রাখে, তাহলে এর প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পানির মান ও প্রাপ্যতার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।”
অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বহু বছরের গবেষণালব্ধ প্রমাণ রয়েছে। এখন এসব প্রমাণকে বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা ও নীতিতে রূপ দেওয়া প্রয়োজন।”
সেমিনারে পানি ও স্বাস্থ্যের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বাড়ানো, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানি ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
