কলকাতার হোটেল অগ্নিকাণ্ড: তদন্তে উঠে আসছে ভয়াবহ অনিয়ম
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে মঙ্গলবার গভীর রাতে আগুনের ঘটনা তদন্তে নানা অনিয়মের চিত্র উঠে আসছে।
আনন্দবাজার পত্রিকার খবর বলছে, বুধবার মির্জা গালিব স্ট্রিটে একটি ভবনের তৃতীয় তলায় আগুন লাগা হোটেল শিখা ইন পরিদর্শন করে পুলিশ, দমকল এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। এ সময় ঘিঞ্জি হোটেলটিতে নানা অনিয়ম দেখে চমকে উঠেছেন তারা।
এমনকি কলকাতা নিউ মার্কেটের আশপাশের এক কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরনের আরো ঘিঞ্জি ঝুঁকিপূর্ণ হোটেলেরও হদিস মিলেছে বলে খবর দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
মঙ্গলবার গভীর রাতে ওই আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাত বাংলাদেশি মারা গেছে বলে নিশ্চিত করেছে কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশন। এছাড়া নিহতদের মধ্যে দুই ভারতীয়ও রয়েছে।
কলকাতায় নানা কাজে ও ঘুরতে যাওয়া বাংলাদেশিদের সস্তায় থাকার জায়গা হিসেবে নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিট ও মার্কুইজ স্ট্রিট পরিচিত। ফলে এসব এলাকায় নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল।
ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিতে গিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, “কয়েক ফুটের রিসেপশন। তাতে একটি টেবিল, একটি সোফা, দেয়ালে টিভি। সঙ্গে আবার যাতায়াতের সরু রাস্তা। ১১০০ বর্গফুটের মধ্যে পাঁচটি ঘর তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটির সঙ্গে লাগোয়া স্নানঘর। চারটিতেই নেই কোনো জানলা। মঙ্গলবার রাতে অগ্নিকাণ্ডের পর বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ, দমকল এবং ফরেনসিক কর্মকর্তারা দেখলেন, সর্বত্র অনিয়মের ছড়াছড়ি। কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে দিনের পর দিন সেখানে হোটেলের ব্যবসা চলছিল। কেউ বাধা দেননি।”
ফরেনসিক দলের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে হোটেলের রিসেপশনে প্রথম আগুন লাগে। ফরেনসিক দলের অনুমান, শর্ট সার্কিটের কারণে আগুনের সূত্রপাত। হোটেলটির প্রত্যেক ঘরের জন্য একটানা একটি ফলস সিলিং ছিল, যা কাঠের তৈরি। এমনকি প্রতি ঘরে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত টানা দেয়ালও ছিল না। ফলস সিলিং পর্যন্ত দেয়াল তুলে ঘরগুলো আলাদা করা হয়। ফলে ওই ফলস সিলিংয়ের উপরের অংশ ফাঁকা ছিল। ঘর এতটাই ছোট যে, আলাদা করে দরজা তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিটি ঘরে স্লাইডিং দরজা করে দেওয়া হয়েছিল।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রিসেপশনের আগুনের ধোঁয়া ফলস সিলিংয়ের ফাঁক দিয়ে ঘরগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলস সিলিং থেকেই এলইডি বাতি লাগানো ছিল প্রতি ঘরে। সেখানেও বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। ফলে আগুনের পর হু হু করে সেখান দিয়ে ধোঁয়া ঘরে ঢুকেছে। স্লাইডিং দরজার ফাঁক দিয়েও ধোঁয়া ঘরে ঢুকেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। এতে ঘরের ভিতরেই দমবন্ধ হয়ে মারা যান হোটেলে অবস্থানরতরা।
ফরেনসিক সদস্যরা আরো বলছেন, ঘরের মধ্যেই দমবন্ধ হয়ে মারা যান আবাসিকরা। তাদের কারও মৃতদেহ বিছানায়, কারও দেহ ঘরের মেঝেতে পড়েছিল। কোনো কোনো ঘরের শৌচালয় থেকেও নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই হোটেল থেকে টিভি, পোড়া তারের অংশ এবং পুড়ে যাওয়া বেশ কিছু নমুনা ফরেনসিক সদস্যরা সংগ্রহ করেছেন।
আনন্দবাজার লিখেছে, হোটেল শিখা ইন-এ প্রবেশ ও বাইরে যাওয়ার একটিই দরজা ছিল। তার লাগোয়া রিসেপশনের সঙ্গে সরু ছোট্ট রাস্তা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিকেরা কেউ ঘরের বাইরে এলেও বেরোতে পারার সম্ভাবনা কম ছিল। কারণ বের হওয়ার রাস্তাতেই আগুন লেগেছিল। একমাত্র দরজা ছিল সেখানেই।
এই ঘটনার পর কলকাতা পুলিশের তরফ থেকে গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনারের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতে আইন মেনে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দুটি ভবন সিল করে দিয়েছে দমকল বিভাগ।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
