তামিমকে ছাড়িয়ে সবার উপরে হৃদয়
পচেফস্ট্রুম যেন তাওহিদ হৃদয়ের জন্য ইতিহাসের মঞ্চ হয়ে উঠল। একদিকে ২০২০ সালের বিশ্বজয়ের স্মৃতি, আর বুধবার (২ আগস্ট) ছিল প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশি হিসেবে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ইনিংস গড়ার কীর্তি।
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় আনঅফিশিয়াল টেস্টে ৩৫০ রানে অপরাজিত থেকে ইনিংস ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ‘এ’ দল। ৪৮১ বলের এই অবিশ্বাস্য ইনিংসে হৃদয়ের ব্যাট থেকে এসেছে ২৭টি চার ও ১০টি ছক্কা। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এর আগে কোনো ব্যাটসম্যান সাড়ে তিনশ রান করতে পারেননি।
এর আগে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ছিল তামিম ইকবালের ৩৩৪ রান। ২০১৯ সালে বিসিএলে পূর্বাঞ্চলের হয়ে মিরপুরে মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে সেই ইনিংস খেলেছিলেন তামিম। হৃদয়ের ৩৫০ সেই রেকর্ডও নতুন করে লিখে দিল।
দেশের বাইরে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ প্রথম শ্রেণির ইনিংসও এখন হৃদয়ের দখলে। ২০০৩ সালে করাচিতে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে ২১৮ রান করেছিলেন শাহরিয়ার হোসেন। সেই রেকর্ড অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছেন হৃদয়।
অথচ শেষ দিন শুরু হয়েছিল হৃদয়ের ২০৪ রানে। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হাতে তখন চার উইকেট। দিনের শুরুতেই নাঈম হাসান ও হাসান মুরাদ ফিরে গেলে অষ্টম উইকেটও হারায় দলটি। হৃদয়ের রান তখন ২২৫। মনে হচ্ছিল, এতক্ষণে গড়া দারুণ ইনিংস বুঝি থেমে যাবে।
কিন্তু তখনই গল্পে নতুন চরিত্র হয়ে এলেন রেজাউর রহমান রাজা। দশ নম্বরে নেমে রেজাউর শুধু উইকেট ধরে রাখেননি, হৃদয়কে দিয়েছেন রেকর্ডের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় সঙ্গ। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে যোগ হয় ১৫৭ রান। আর সেই জুটির শেষেই বাংলাদেশ ‘এ’ দলের স্কোর দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ৬৭৬।
এর মধ্যে হৃদয় একের পর এক মাইলফলক পেরিয়েছেন। ৩৮১ বলে পূর্ণ করেন ২৫০। লাঞ্চে যান ২৭৪ রানে। নতুন বলেও থামানো যায়নি তাঁকে। ৪৫০ বল খেলে পৌঁছে যান ৩০০’তে।
কিন্তু ৩০০’তেই থামার কোনো ইচ্ছা ছিল না তাঁর। চা-বিরতির সময় হৃদয়ের নামের পাশে ৩৩৩ রান। তখন দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ অধিনায়ক মার্কের আকারম্যান তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ইনিংস ঘোষণা করা হবে কি না। হৃদয় তখনও ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কারণ অপেক্ষা ছিল আরও একটি সংখ্যার জন্য ৩৫০। তিনশ থেকে সাড়ে তিনশতে যেতে হৃদয়ের লেগেছে মাত্র ৩১ বল। টেপো এনটুলির বল মিডউইকেটে ঠেলে সিঙ্গল নিয়ে যখন ৩৫০ পূর্ণ করলেন, তখন আর উদযাপনে মাতেননি। আম্পায়ারের দিকে দেখালেন ‘থামস আপ’। বার্তা পরিষ্কার, এবার থামব আমি।
অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়ের সেই সংকেতের পরই ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ ‘এ’ দল। হৃদয় তখন অপরাজিত ৩৫০। পাশে রেজাউর ১১০ বলে ৩১ রানে অপরাজিত। ড্রেসিংরুমে ফেরার সময় প্রতিপক্ষের ক্রিকেটাররা এসে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁকে। সতীর্থরাও বরণ করে নিয়েছেন অধিনায়ককে।
এই ইনিংসের আরেকটি বিশেষত্ব লুকিয়ে আছে পচেফস্ট্রুমের মাঠটিতে। ছয় বছর আগে, এই দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল জিতেছিল যুব বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বজয়ী দলের সদস্য ছিলেন হৃদয়। এবার সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারকে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাসেও হৃদয়ের ৩৫০ বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। দেশটির মাটিতে বিদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এর আগে ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল কেবল ইংল্যান্ডের ডেনিস কম্পটনের। ১৯৪৮ সালে এমসিসির হয়ে ৩০০ করেছিলেন তিনি।
আর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে হৃদয়ের ৩৫০ এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। তাঁর ওপরে কেবল স্টিভেন কুকের ৩৯০। ২০০৯ সালে লায়ন্সের হয়ে ৬৪৮ বল খেলে সেই ইনিংস খেলেছিলেন কুক।
