দিনে পদ্মাপাড়ে সুনসান নীরবতা, রাত হলে পোড়ানো হয় ব্যাটারি
দিনে সুনসান নীরবতা। সবুজ রঙের ত্রিপল দিয়ে ঘেরা। তবে গভীর রাতের চিত্র পুরো ভিন্ন। তখন সেখানে উন্মুক্তভাবে ভাঙা হয় শত শত পুরোনো ব্যাটারি। তাতে আবার কয়লা ও কাঠের আগুন জ্বালিয়ে বের করা হয় বিষাক্ত সিসা। যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
পদ্মা নদীর ওপারে (উত্তর) কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চরসাদিপুর ইউনিয়নের সাদিপুর নৌকাঘাট সংলগ্ন দেলোয়ার হোসেনের ইটভাটা এলাকায় প্রতিদিন বিকেল ও মধ্যরাতে এ দৃশ্য দেখা যায়।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক শ্রমিকরা জানান, পাবনার মনির হোসেন নামের একজন কারখানাটির মালিক। প্রায় দেড়মাস ধরে চলছে কারখানাটি। আপনারা মালিকের সঙ্গে কথা বলুন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অপরিকল্পিত, অনিরাপদ ও অবৈধভাবে পরিচালিত পুরাতন সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানা থেকে নির্গত সিসাযুক্ত ধোঁয়া, দূষিত ধূলি কণা ও রাসায়নিক পদার্থ-মাটি, পানি, বায়ুতে মিশে চারপাশকে দূষিত করে, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় দুইমাস ধরে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে কারখানাটি চললেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এতে হুমকিতে পড়েছে নদীপাড়ের শত শত বিঘা কৃষি জমি ও ফসল।
মুঠোফোনে ইটভাটার মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, পাবনার মনির স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাত করে নিয়েছে। মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে। বার বার নিষেধ করার পরও বন্ধ হয়নি। আপনারা ব্যবস্থা নিন।
অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করার কথা স্বীকার করেছেন পাবনার মনির হোসেনও। তিনি মুঠোফোনে বলেন, সবাইকে ম্যানেজ করেই দেড়মাস ধরে চলছে কারখানা। তবে বাতাসের কারণে অধিকাংশ দিনই বন্ধ রাখতে হয়। ব্যবসায় লাভ হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, দিনের বেলা কোনো কাজ করে না। রাত সাড়ে ১১টার পর ট্রাক ভরে মাল আসে। আর ১২টার দিকে জ্বালানো হয় আগুন।
তার ভাষ্য, চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান টিক্কা, বিএনপির কর্মী জালাল ও হযরতের ছত্রছায়ায় চলছে অবৈধ কারখানা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদীপাড়ের কলা, সবজিসহ সব ফসল ক্ষতির মুখে পড়বে।
অভিযোগ অস্বীকার করে চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান টিক্কা বলেন, ‘কারা কী করছে জানি না। আমি এসবে নাই। আপনারা মনিরের সঙ্গে মিলতাল করে নেন।’
তবে অবৈধ ব্যাটারি কারখানার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নয় বলে জানালেন চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজম। তিনি বলেন, ‘দিন পনেরো আগে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কারখানার লোকদের দৌড়ানি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চলে কি না তা জানা নেই।’
কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (সিনিয়র কেমিস্ট) হাবিবুল বাসার ফোনে জানান, ব্যাটারির ভেতরে সালফিউরিক অ্যাসিড থাকে। উন্মুক্তভাবে ব্যাটারি ভেঙে সিসা বের করার ফলে বাতাসে সিসা ও লেডের পরিমাণ বেড়ে যায়। যা পরিবেশ ও মাটির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এ ঘটনায় দ্রুত অবৈধ ব্যাটারি কারখানায় অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন কুমারখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার।
আল-মামুন সাগর/এফএ/জেআইএম
