নেপালে আকস্মিক বন্যায় ৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ, নিহত ৫৫


নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত–সংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে প্রবল বন্যায় ৫৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আজ বুধবারের এই বন্যায় রাস্তাঘাট, সেতু ও বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। বিভিন্ন খবরের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, বুধবার রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যার পর ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ হন। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি ও ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। পর্যটন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১০৫ জন ভারতীয় পর্যটক রয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের পর্যটক রয়েছেন ১২ জন।

ভোতেকোশি নদী উত্তর নেপালের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চীন সীমান্তের দিকে গেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৯টার দিকে নদীটির দুই কূল উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে বেশ কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে রাস্তাঘাট ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের।

এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জেলায় সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হয়েছে।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, একটি বরফধসের কারণে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে যায়। আর এর জের ধরেই ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক এই বন্যার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য, ভোতেকোশি হলো লেন্দে নদীরই একটি উপনদী।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তেই মূলত ভূমিধসের ঘটনাটি ঘটেছে। এটি জিরং বন্দরে আঘাত হানে। এতে নেপাল সীমান্তবর্তী শিগাতসে অঞ্চলে সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত আর কিছু জানায়নি।

নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল বলেন, ‘উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য আমরা ভারত ও চীন উভয় দেশকেই অনুরোধ জানিয়েছি।’

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির ইয়োনহাপ বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আটজন দক্ষিণ কোরীয় কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন। এ ছাড়া আরও ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় কর্মী সেখানে আটকা পড়েছেন। তাঁদের উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার পাঠানো হবে।

বন্যায় প্লাবিত ধাদিং জেলার গালচি এলাকা। মুঠোফোনে ছবিটি তোলা হয়। নেপাল, ২৬ আগস্ট ২০২৬

বন্যায় প্লাবিত ধাদিং জেলার গালচি এলাকা। মুঠোফোনে ছবিটি তোলা হয়। নেপাল, ২৬ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকেই কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় অংশ নেওয়া তীর্থযাত্রী বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁরা তিব্বতের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘টাচ কৈলাস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বসু কুমার অধিকারী জানান, ৯৩ জন নেপালিসহ মোট ৩৯০ জন তীর্থযাত্রীর ওই সীমান্ত পার হওয়ার কথা ছিল। কাঠমান্ডু পোস্টকে তিনি বলেন, ‘বেলা তিনটা পর্যন্ত আমরা মাত্র কয়েকজনের খোঁজ পেয়েছি। বাকি কোনো তীর্থযাত্রীর সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারিনি।’

নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান এবং ৩ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। তবে নিখোঁজ আরও ১১১ জনের জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পানির তোড়ে নেপালে বহু ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট ভেসে গেছে। অন্যদিকে তিব্বতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের একটি স্থলবন্দরে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে জিরং কাউন্টিতে বেশ কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন। সেখানে ‘ব্যাপক প্রাণহানির’ আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

নেপালের পাহাড়ি জেলা রসুয়ায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। কর্মকর্তারা জানান, নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে জেলার উপদ্রুত স্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো অবতরণ করতে পারেনি।

কান্তিপুর পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যাকবলিত রসুয়ায় ত্রাণ নিয়ে তিনটি হেলিকপ্টার রওনা হয়েছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেগুলো কাঠমান্ডুতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এতে উদ্ধার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দৃশ্যগুলোতে বন্যার পানিতে ভেঙে পড়া বাড়িঘর ও ভাসমান গাড়ি দেখা গেছে। পানির তোড়ে একটি লোহার সেতুও ভেসে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, বন্যার পানিতে আস্ত গ্রাম তলিয়ে গেছে।

রসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার বলেন, ‘বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।’ গ্রামের পর গ্রাম এবং বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই তিনি ভোতেকোশি নদীর তীরের বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

রসুয়া জেলার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বি কে রয়টার্সকে বলেন, ‘যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই শুধু ধ্বংসযজ্ঞ চোখে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নদীর পাশের জনবসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পরিবারেরই পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন।’

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বস্নেত জানিয়েছেন, পানি না কমা পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারবে না।

আকস্মিক এই বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে গত বছরও একই নদীতে এক ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। পরে জানা যায়, একটি হিমবাহের হ্রদ থেকে ওই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।

এদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ তল্লাশি অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। একই সঙ্গে বন্যা–পরবর্তী অন্য কোনো দুর্যোগ এড়াতে নজরদারি ব্যবস্থা ও আগাম সতর্কসংকেত আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *