‘ভক্তির আতিশয্য ও নির্মম বিদ্বেষ থেকে লালনের মুক্তি হোক’
প্রথম আলো: শুষ্ক তথ্যকে প্রাণবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে একজন গবেষকের সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা কতটা জরুরি?
আবুল আহসান চৌধুরী: গবেষকের যদি সাহিত্যবোধ বা সাহিত্যদৃষ্টি, আরও স্পষ্ট করে বললে সৃজনশীল সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ না থাকে তবে তাঁর রচনা প্রাণহীন না হয়ে পারে না। মননধর্মী বা গবেষণামূলক যে ধরনের কাজই হোক না কেন ‘সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা’ না থাকলে তা হয়ে ওঠে রিপোর্ট বা প্রতিবেদন বা নিছকই বিবরণধর্মী তথ্যপঞ্জি। সাহিত্যবোধ ভাষাকেও সংবেদ্য, ব্যঞ্জনাধর্মী ও গতিময় করে তোলে—বিষয়কে প্রাঞ্জল ও বিশ্লেষণকে যুক্তিনিষ্ঠ হতে সহায়তা করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে চটজলদি যদি নাম করতে হয় তবে আসবে মুনীর চৌধুরী, সন্জীদা খাতুন, আনিসুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, গোলাম মুরশিদ বা হায়াৎ মামুদের নাম।
প্রথম আলো: আপনার নিজের কোন গবেষণাটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দিয়েছে?
আবুল আহসান চৌধুরী: আমি নানা বিষয়ে কাজ করেছি, আমার কাজের ভুবন বিচিত্র বিষয়কে ধারণ করেছে—লালন, কাঙাল হরিনাথ, মশাররফ, সংগীত-সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি, সাময়িকপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস, বিস্মৃত লেখক এবং আরও অনেক বিষয়। তবে আমার প্রধান দুর্বলতা ও অনুরাগ লালনের প্রতি। তাই বাংলা একাডেমি লালন বিষয়ে যে বইটি প্রায় চল্লিশ বছর আগে বের করেছিল এবং পরে লালনকে নিয়ে আমার আরও যে একগুচ্ছ বই প্রকাশ পায়—এসব বই-ই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ, তৃপ্তি ও গৌরব দান করেছে।
প্রথম আলো: এমন কোনো কাজ আছে কি, যেটি আপনি এখন নতুন করে করতে চাইতেন?
আবুল আহসান চৌধুরী: প্রায় এক যুগ আগে বাঙালির কলের গান নামে আমার একটি বই বের হয়েছিল। বয়স্ক বাঙালির মধুর স্মৃতি উসকে দেওয়ার নানা উপকরণ এতে আছে। যদি হাতে সময় ও সুযোগ থাকত তাহলে বইটির পুনর্লিখন ও পুনর্বিন্যাস করতে পারতাম।
প্রথম আলো: এত বছর গবেষণা করার পর আজ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা কী বলে মনে হয়?
আবুল আহসান চৌধুরী: এর জবাব দিতে গেলে আফসোস ও হাহাকার জাগবে। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে এখন আর কোনো গবেষণা হয় না—জাত-গবেষক গড়ে ওঠার সুযোগ নেই। এর জন্যে কমবেশি দায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বাংলা একাডেমিও তার দায় এড়াতে পারে না। অন্যান্য সারস্বত প্রতিষ্ঠানও এই অভিযোগের আওতার বাইরে নয়। আর কী কখনো মানে-মাপে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. আহমদ শরীফ, ড. আনিসুজ্জামানের মতো গবেষক পাওয়া যাবে! কবি আবদুল কাদির বা আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো নিষ্ঠ সম্পাদনা-কুশলীর জন্যে কত কাল, কত যুগ প্রতীক্ষায় থাকতে হবে! এখন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বেশিরভাগই মানহীন, বৈচিত্র্যবর্জিত, পূর্বকথার চর্বিতচর্বণ, আবার কখনোবা কুম্ভিলক বৃত্তির নিকৃষ্ট নিদর্শন। বৈশ্য-সমাজের এই তো অনিবার্য নিয়তি!
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আবুল আহসান চৌধুরী: ধন্যবাদ আপনাকে।
