মরুভূমিতে বরফ! প্রকৃতির এই কাণ্ড কীভাবে সম্ভব?


মরুভূমি মানেই তীব্র গরম, শুকনো বাতাস আর ধু-ধু বালুর প্রান্তর। কিন্তু সেই মরুভূমিতেই যখন সাদা বরফের চাদর দেখা যায়, দৃশ্যটি অবাক করার মতোই। সাহারা থেকে আতাকামা—বিশ্বের কয়েকটি শুষ্ক মরুভূমিতে এমন বিরল তুষারপাতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এত গরম ও শুষ্ক জায়গায় বরফ নামে কীভাবে?

সাধারণ ধারণায় মরুভূমি আর বরফ যেন একেবারেই বিপরীত দুটি বিষয়। বাস্তবে অবশ্য বিষয়টি এত সরল নয়। মরুভূমি মূলত কম বৃষ্টিপাতের অঞ্চল; এর অর্থ এই নয় যে সেখানে সবসময় প্রচণ্ড গরম থাকবে। বরং পরিষ্কার আকাশ ও কম আর্দ্রতার কারণে মরুভূমিতে দিনের পর রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

সাহারাতেও দেখা গেছে বরফ

আফ্রিকার সাহারা বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত মরুভূমিগুলোর একটি। অথচ আলজেরিয়ার আইন সেফরা (Aïn Séfra) অঞ্চলে একাধিকবার তুষারপাতের ঘটনা ঘটেছে।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে সেখানে তুষারপাতের পর ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারিও মরুভূমির বালিয়াড়ি বরফে ঢেকে যায়। নাসার স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে সেই বিরল দৃশ্য। ২০১৮ সালে কিছু উঁচু এলাকায় প্রায় ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষার জমেছিল বলে নাসা জানিয়েছে। তবে উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ বরফ এক দিনের মধ্যেই গলে যায়।

বরফ তৈরির জন্য মূলত দুটি জিনিস প্রয়োজন—পর্যাপ্ত আর্দ্রতা এবং হিমাঙ্কের কাছাকাছি বা তার নিচে তাপমাত্রা। মরুভূমিতে সাধারণত বাতাসে জলীয়বাষ্প কম থাকে। তাই তুষারপাত খুবই বিরল। কিন্তু বিশেষ কোনো আবহাওয়াগত পরিস্থিতিতে আর্দ্র বায়ু ও ঠান্ডা বায়ু একই অঞ্চলে চলে এলে মেঘ তৈরি হতে পারে এবং তাপমাত্রা যথেষ্ট কম থাকলে বৃষ্টির বদলে তুষার পড়তে পারে।

অর্থাৎ, মরুভূমিতে বরফ পড়া অসম্ভব নয়—শুধু সেই আবহাওয়ার সমীকরণটি খুব কমই তৈরি হয়।

এখানেই লুকিয়ে আছে আরেকটি মজার তথ্য। মরুভূমির বাতাসে জলীয়বাষ্প ও মেঘ কম থাকে। ফলে দিনের বেলায় সূর্যের তাপে মাটি গরম হলেও রাতে সেই তাপ দ্রুত মহাশূন্যে বিকিরিত হয়ে যায়। তাই মরুভূমিতে দিনের প্রচণ্ড গরমের পর রাতের তাপমাত্রা অনেক নিচে নেমে যেতে পারে। এই কারণেই ‘মরুভূমি মানেই সবসময় গরম’—এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।

ছবি: সংগৃহীত

শুধু সাহারা নয়, আতাকামাতেও বরফ!

দক্ষিণ আমেরিকার আতাকামা মরুভূমি পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি। কিন্তু সেখানেও তুষারপাতের নজির রয়েছে।
২০২৫ সালের ২৫ জুন একটি বিরল ঠান্ডা আবহাওয়াব্যবস্থা আতাকামার উচ্চভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় তুষারপাত ঘটায়। নাসার তথ্য অনুযায়ী, cutoff low নামে পরিচিত ঠান্ডা বায়ুর একটি আবহাওয়াগত ব্যবস্থা এই অঞ্চলে তুষার ও বৃষ্টির মতো শীতকালীন বৃষ্টিপাতের অন্যতম কারণ।

আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের আগস্টে। পরপর দুটি শীতকালীন ঝড়ে উত্তর চিলির আতাকামার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বরফে ঢেকে যায়। নাসার স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে, তুষারপাত আন্দিজ পর্বতমালা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের কাছাকাছি অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।  আতাকামার শুষ্কতার পেছনে রয়েছে আশপাশের ভৌগোলিক অবস্থান। একদিকে আন্দিজ পর্বতমালা, অন্যদিকে চিলির উপকূলীয় পর্বতমালা ও ঠান্ডা হামবোল্ট স্রোত—সব মিলিয়ে সেখানে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম।

তবে বিশেষ ধরনের ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহ এই স্বাভাবিক আবহাওয়াকে সাময়িকভাবে বদলে দিতে পারে। তখন মরুভূমির উচ্চভূমিতে তুষারপাতের মতো বিরল ঘটনা ঘটে।

মরুভূমিতে বরফ পড়া আসলে প্রকৃতির কোনো নিয়ম ভাঙা নয়। বরং এটি দেখায়, একটি অঞ্চলের জলবায়ু শুধু দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দিয়ে বোঝা যায় না। যেখানে বছরের অধিকাংশ সময় বৃষ্টি নেই, সেখানেও বিশেষ আবহাওয়ায় তুষারপাত হতে পারে। সাহারার বালিয়াড়িতে সাদা বরফ কিংবা আতাকামার শুষ্ক ভূমিতে তুষারের চাদর তাই শুধু সুন্দর দৃশ্য নয়—এটি বায়ুমণ্ডল, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার জটিল সম্পর্কের এক চমকপ্রদ উদাহরণ।

অদ্ভুত সত্য হলো—মরুভূমি গরম হতে পারে, কিন্তু বরফের জন্য তার দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়।

তথ্যসূত্র: নাসা, ইউরোপিয়ান সাউথ অবজারভেটরি



বাপ্পি/সা.এ





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *