সংসদ থেকে বিরোধীদলের ওয়াকআউট
মানবাধিকার রক্ষায় ও গুম প্রতিরোধে পাস হতে যাওয়া আইন ‘দুর্বল’ হচ্ছে উল্লেখ করে এসব আইন পাসের আগে জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) বিল ২০২৬’ উপস্থাপনের ঠিক আগে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দলের এমপিরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী, মানবাধিকার কমিশন বিল পাসের পরই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে আনা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’ সংসদে উত্থাপনের করার কথা।
মানবাধিকার কমিশন বিলটি উপস্থাপনের আগে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আজ সংসদে দুটি বিল আসতে যাচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। এর আগের অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জারি করা অধ্যাদেশগুলো যখন সরকার বাতিল করে, তখন তারা বলেছিল আইনের আরও অনেক শক্তিশালী ও উন্নত সংস্করণ আনা হবে। আমরা আমাদের মতামত আগেই জানিয়েছি।
তিনি বলেন, উত্থাপিত মানবাধিকার কমিশন বিলে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনকে অভিন্ন ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। একজন সাধারণ নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারে। কিন্তু কোনো বাহিনী যুক্ত থাকলে, সেই বাহিনীর কাছ থেকে জবাব চাওয়া হয়। প্রথমবার জবাব না দিলে কী হবে, আইনে সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আর জবাব যদি দেয় কিন্তু কমিশন তা সন্তোষজনক মনে না করে, তবে আবার জবাব চাইতে পারে। দ্বিতীয় জবাবও অসন্তোষজনক হলেই কমিশন তদন্ত করতে পারবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এটি একটি দুর্বলতা প্রকাশ করে…আর আইনের প্রয়োগে এমন দ্বৈত নীতি থাকতে পারে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের কর্মচারী, তবে তারাও এই দেশের নাগরিক। একই অপরাধের জন্য একজনের বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করা যাবে, অথচ অন্যজনের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া আটকে রাখা হবে—এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সরকার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। যেহেতু আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে দুর্বল আকারে আইনটি ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, তাই আমরা এই আইন পাসের অংশ হবো না। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা এই আইনের আলোচনায় অংশ নিচ্ছি না এবং আমরা এখনই ওয়াকআউট করছি, বলেন শফিকুল রহমান।
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ওয়াকআউট করার জন্য ধন্যবাদ।
পরে বিল উপস্থাপনের সময় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিরোধী দলের ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমরা সত্যিই আইনকে আরও শক্তিশালী করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যে জায়গাগুলোতে আমরা এটিকে শক্তিশালী করেছি, বিরোধী দল তা শোনার জন্য অপেক্ষা করেনি।
তিনি দাবি করেন, প্রস্তাবিত মানবাধিকার কমিশন বিলটি উপমহাদেশের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
আইনমন্ত্রী বলেন, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে সিলেকশন কমিটির প্রধান থাকেন প্রধানমন্ত্রী। আর পশ্চিমা বিশ্বে নির্বাচন কমিটিতে বিচার বিভাগের নেতৃত্ব থাকে না। এখানে আমরা আমাদের মহান সংসদকে কেন্দ্রে রেখেছি। আপনার (স্পিকারের) নিরপেক্ষ নেতৃত্বের ওপর আমরা সিলেকশন কমিটির দায়িত্ব অর্পণ করেছি। আমরা এই প্রতিষ্ঠানের ওপর, এই সংসদের ওপর সর্বোচ্চ আস্থা রাখতে চেয়েছিলাম।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৭ আগস্ট গুম ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিল দুটি সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল। সেদিনও বিল উত্থাপনের আগে বিরোধী দল ওয়াকআউট করেছিল।
পরে বিরোধী সংসদও সদস্যরা এ সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনাও বয়কট করে। বিরোধী দলের অভিযোগ, ভুক্তভোগী পরিবার, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো একতরফাভাবে বাতিল করেছে বর্তমান সরকার। বাতিলের সময় শক্তিশালী আইনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সংসদে দুর্বল বিল আনা হয়েছে।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ (২০২৪ ও ২০২৫ সালে) জারি করা হয়েছিল। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপি সরকার এই তিনটি অধ্যাদেশ পাস না করায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
একইভাবে, গুম সম্পর্কিত দুটি অধ্যাদেশও নির্ধারিত সাংবিধানিক সময়ের মধ্যে সংসদে পাস না করায় বাতিল হয়ে যায়।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পরবর্তীতে সরকার এই দুটি বিষয়ে নতুন করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।
বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম
