সাহিত্যের সন্তান মহানায়ক উত্তম কুমার
আজ ৩ সেপ্টেম্বর কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের জন্মদিন। বাংলা চলচ্চিত্রে তাকে বলা হয় মহানায়ক। এই মহানায়কের জন্মদিনকে সামনে রেখে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, “মহানায়ক উত্তম কুমার চিরদিন মানুষের হৃদয়ে রাজ করবেন।” কিন্তু তিনি কীভাবে মহানায়ক হলেন? এই জিঘাংসা বারবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে উত্তম কুমারের পরপর কয়েকটি সিনেমা সাফল্য পায়নি। সেই সময় তাকে ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বলেও কটাক্ষ করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে নিজের অভিনয়কে আরো নিখুঁত করার চেষ্টা চালিয়ে যান। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং নিজের প্রতিভার প্রতি বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলা সিনেমার মহানায়কের আসনে বসায়। মহানায়কের জীবনের অন্যতম বড় বার্তা হল—কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
আসল বিষয় হলো চিত্রনাট্যকারদের নিজস্ব গল্প, চিত্রনাট্য ছাড়াও ক্ষণজন্মা অভিনেতা উত্তম কুমারের একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে। সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি অন্য থেকে হয়ে উঠেছেন অনন্য। সাহিত্যের সৃষ্ট চরিত্রগুলোতে প্রাণসঞ্চার অভিনয় করে তিনি নায়কের গণ্ডি পেরিয়ে মহানায়কের খেতাব কুড়িয়ে নিয়েছেন দর্শকের কাছ থেকে। এক সময় তাকে সাহিত্যের সন্তানও বলা হতো।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের রম্যরচনা অবলম্বনে নির্মিত ‘ভ্রান্তবিলাস’ চলচ্চিত্রের মতো বহু ক্লাসিক সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্রে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের (বনফুল) মতো প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের গল্প ও উপন্যাসের চিত্ররূপে উত্তম কুমারের অভিনয় বাংলা সাহিত্যকে দৃশ্যমান এক নান্দনিক রূপ দেয়। উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্রগুলোকে তিনি তার নিজস্ব ক্যারিশমা, সংলাপ প্রক্ষেপণ ও অভিব্যক্তি দিয়ে জীবন্ত করে তুলতেন, যা সাধারণ মানুষের মন জয় করেছিল। দর্শকের কাছে উত্তম কুমার কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না। পর্দায় তার উপস্থিতি, অভিনয়ের সহজাত ভঙ্গি এবং গভীর আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা দিয়ে বিশেষভাবে প্রশংসনীয় হয়েছেন দর্শকের কাছে।
বিদ্যাসাগরের কাহিনি আশ্রিত ‘ভ্রান্তবিলিাস’ সিনেমায় উত্তম কুমার দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শুধু তাই নয়, এই সিনেমার প্রযোজকও ছিলেন তিনি। চিরঞ্জীব ও চিরঞ্জিৎ জন্মসূত্রে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুই ভাই ঘটনাচক্রে আবার মুখোমুখি হয়। এদের দুই ভৃত্য শক্তিকিঙ্কর ও ভক্তিকিঙ্করও মুখোমুখি হয়। ফলে দম ফাটা হাসির সিনেমা হয়ে উঠে ‘ভ্রান্তবিলাস’। বিদ্যাসাগরের এই রম্যরচনাটির মূল উৎস হলো উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘কমেডি অব এররর্স’।
উত্তম কুমার যখন উত্তম কুমার হননি, সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের ‘দৃষ্টিদান’ সিনেমায় অসতিবরণের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পরিচালক ছিলেন নীতিন বসু। কিন্তু তিনি দর্শকের নজর কাড়লেন নরেশ মিত্র পরচিালতি ‘বউঠাকুরানীর হাট’ এবং দেবকীকুমার বসু পরিচালিত ‘চিরকুমার সভা’ সিনেমায়। দু’টি ভিন্নধর্মী চরিত্র। দুটো চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল। বিভূতি লাহা যখন ‘খোকাবাবুর প্রত্যার্বতন’ সিনেমার চিত্রনাট্য লিখছিলেন তখন উত্তম কুমার ওই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিভূতি লাহা জানালেন, তাকে দেওয়ার মতো অর্থ প্রযোজকের নেই। উত্তম কুমার স্পষ্ট করে জানালনে, ‘টাকা চাই না, রাইচরণ রোলটা চাই’। তারপর তিনি রোমান্টিক সিনেমার গ্ল্যামার মুছে ফেলে যুক্ত হলেন সিনেমাটিতে। আর রোমান্টিক ইমেজ ভেঙে প্রভুভক্ত ভৃত্য রাইচরণের চরিত্রে যে অভিনয় করলেন, তার বোধহয় কোনো তুলনা নেই।
শরৎচন্দ্রের মামা উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছদ্মবশেী’ চরিত্রে উত্তম কুমার দেখালেন কমিক চরিত্র কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়। নকল ড্রাইভার সেজে নিজের স্ত্রীর দিদি-জামাইবাবুকে নাজেহাল করার নানান ঘটনায় ভরপুর ছিল ‘ছদ্মবশেী’। অগ্রদূতের পরিচালনায় ও সুধীন দাশগুপ্তের সুরে উত্তমের লিপে মান্না দে’র কয়কেটি গান আজও শ্রোতাদরে মুগ্ধ করে রেখেছে।
উত্তম কুমার শরৎ কাহিনিতে প্রথম এলেন ‘বড়দিদি’ সিনেমার রিমেকে। সব রিমেক সাড়া ফেলতে পারে না। ‘ছদ্মবশেী’ রিমেক কিন্তু সফল হলো। তেমনটা ঘটল না ‘বড়দিদি’-এর ক্ষেত্রে। দর্শক মনে সুরেন্দ্ররূপী পাহাড়ি সান্যাল ও মাধবীরূপী মলিনা দেবী বেশি দাগ কেটেছিল। রিমেক ‘বড়দিদি’-তে সুরেন্দ্ররূপী উত্তম কুমার ও মাধবীরূপী সন্ধ্যারাণী সেক্ষেত্রে উৎরাতে পারেননি। রিমেক সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন অজয় কর। পাশা উল্টে গেল ‘চন্দ্রনাথ’ সিনেমার মাধ্যমে। চন্দ্রনাথরূপী উত্তম কুমার ও সরযূরূপী সুচিত্রা সেন দর্শক মনে তুমুল আলোড়ন তোলেন। সিনেমাটির পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। সেই একই ধারাবাহিকতা ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ সিনেমার ক্ষেত্রেও বজায় থাকল। মমতা পকির্চাস-এর ব্যানারে নির্মিত হরিদাস ভট্টার্চায পরিচালিত এ সিনেমার নামভূমিকা দুটিতে অভিনয় করেন সুচিত্রা সেন ও উত্তম কুমার। তারা যেন সাহিত্যের পাতা থেকেই উঠে এলেন। উত্তম কুমার প্রযোজনা করলেন ‘গৃহদাহ’। এটিও রিমেক। যেহেতু মহিমের চরিত্রে উত্তম কুমার আর অচলার চরিত্রে সুচিত্রা সেন, সেহেতু সিনেমা যে দর্শক আনুকুল্য-ধন্য হবেই তা বলাই বাহুল্য।
পরিচালক সুবোধ মিত্র এই জুটিকে আবার পেলেন শ্রীকান্ত উপন্যাসরে চতুর্থ পর্ব অবলম্বনে নির্মিত ‘কমললতা’ সিনেমায়। শ্রীকান্ত যথারীতি উত্তম কুমার ও কমললতা চরিত্রে সুচিত্রা সেন। হরিসাধন দাশগুপ্ত পরিচালিত এ সিনেমার আবেদন আজও অম্লান। যেমনভাবে লোকে মুগ্ধ হয়ে আজও শোনেন রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্রের গাওয়া এ সিনেমার গানগুলো। ‘পথের দাবী’ সিনেমার পরে নাম হলো ‘সব্যসাচী’। এ সিনেমায় উত্তম কুমার শুধু নাম ভূমিকায় অভিনয়ই করেননি, এ সিনেমার সংগীত পরিচালকও তিনি। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের একটি কাহিনিতে উত্তম কুমার অভিনয় করেছেন। সেটি হলো ‘ইন্দ্রাণী’। নিরেন লাহিড়ী পরিচালিত এ সিনেমার নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন। এ সিনেমার উত্তম-সুচিত্রার হেমন্ত-গীতা দত্তের গানগুলো আজও জনপ্রিয়। আশার্পূণা দেবীর ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমা থেকে উত্তম-সুচিত্রা জুটির জয়যাত্রা শুরু। সিনেমাটির পরিচালক অগ্রদূত। কিরীটির চরিত্রে উত্তম কুমার, তাপসীর ভূমিকায় সুচিত্রা সেন। অনুপম ঘটকের সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলো আজও শ্রোতা হৃদয়ে আবেদন সৃষ্টি করে। মলি মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ভূতনাথ এবং ‘স্ত্রী’ সিনেমায় মাধব দত্ত উত্তম কুমারের জীবনরে দুটি দিকচিহ্ন।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বেশ কিছু কাহিনির চিত্ররূপে পাওয়া গেছে উত্তম কুমারকে। শুরু ‘জীবন তৃষ্ণা’ সিনেমা দিয়ে। তারপর একে একে ‘শঙ্খবেলা’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘সবরমতী’, ‘নবরাগ’, ‘চাঁদের কাছাকাছি’ এবং ‘আরও একজন’। আলাদা বলার অপক্ষো রাখে ‘কাল তুমি আলেয়া’ সম্পর্কে। শচীন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এ সিনেমার সুরকার উত্তম কুমার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও আশা ভোঁসলেকে দিয়ে তিনি গান গাইয়েছেন। ধীরপদের চরিত্রে তার অভিনয় ছিল মনোমুগ্ধকর। এ সিনেমায় আরো ছিলেন লাবণ্যরূপী সুপ্রিয়া দেবী এবং সোনা বৌদিরূপী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। ‘আমি সে ও সখা’ সিনেমায় উত্তম কুমার দ্বৈত চরিত্রে মননশীল অভিনয় করেছেন। মঙ্গল চক্রবর্তীর পরিচালনায় উত্তম কুমারের সঙ্গে ছিলেন কাবেরী বসু ও আরতি ভট্টার্চায।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেশ কিছু কাহিনিতেও উত্তম কুমার অভিনয় করেছেন। শুরুটা ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’ দিয়ে। নির্মল দের পরিচালনায় বউদি ও দেওর হলেন অনুভা গুপ্তা ও উত্তম কুমার। কাবেরী বসু প্রথম যে সিনেমায় এলেন তার নাম ‘রাইকমল’। নামভূমিকায় তিনি এবং অঞ্জনের চরিত্রে উত্তম কুমার। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন সুবোধ মিত্র। ‘বিচারক’ সিনেমায় বিচারক জ্ঞানেন্দ্রনাথের চরিত্রে ছিলেন উত্তম কুমার। দ্বিতীয় স্ত্রী সুরমার চরিত্রে অরুন্ধতী, প্রথম স্ত্রী সুমতির চরিত্রে দিপ্তী রায়। সিনেমাটি পরিচালনা করেন অরুন্ধতী দেবীর প্রথম স্বামী প্রভাত মুখোপাধ্যায়।
শুরুতেই ‘উত্তরায়ণ’ সিনেমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারাশঙ্করের ‘বিপাশা’, ‘কান্না’, ‘শুকসারি’, ‘মঞ্জরী অপেরা’, ‘দুই পুরুষ’, ‘রাজা সাহবে’ সিনেমাতেও উত্তমকুমার যথারীতি প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। তবে বাংলা সিনেমার আরেক মাইলস্টোন ‘সপ্তপদী’ সিনেমাটিও তারাশঙ্করের কাহিনি অবলম্বনেই নির্মিত হয়েছে। এ সিনেমার প্রযোজকও উত্তম কুমার। সিনেমাটিতে দুই চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। রীনা ব্রাউনরে ভূমিকায় ছিলেন সুচিত্রা সেন। মূল উপন্যাস থেকে অবশ্য অনকেটাই সরে গিয়েছিল সিনেমার চিত্রনাট্য। তবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে হেমন্ত-সন্ধ্যার গাওয়া ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানটি আজও দর্শক-শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছে।
বিশিষ্ট আরো বেশ কয়েকজন গল্পকারের একটি করে কাহিনির চিত্ররূপে উত্তম কুমার অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, ‘ধনরাজ তামাং’, অবধূতরে ‘মরুর্তীথ হিংলাজ’, অনুরূপা দেবীর ‘মন্ত্রশক্তি’, নারায়ণ সান্যালের ‘যদি জানতেম’, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ‘শাপমোচন’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নিশিপদ্ম’, মহাশ্বেতা দেবীর ‘মোমবাতি’, রমাপদ চৌধুরীর ‘বনপলাশির পদাবলী’, রবীন্দ্রনাথ মৈত্রের ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’, শক্তিপদ রাজগুরুর ‘অমানুষ’, শঙ্করের ‘চৌরঙ্গী’, শৈলেশ দে’র ‘তিন অধ্যায়’, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘আনন্দমেলা’।
এর মধ্যে কয়কেটি কথা আলাদাভাবে বলা যেতে পারে। ‘শাপমোচন’ সিনেমায় উত্তমের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুরু হয়েছে এই প্রথম। ‘নিশিপদ্ম’ সিনেমাটি গড়ে উঠেছে বিভূতিভূষণের ‘হিংয়ের কচুরি’ গল্প থেকে। সে গল্পে উত্তম কুমার অভিনীত অনঙ্গ দত্ত চরিত্রটি ছিল না, এটি পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের সংযোজন। সেটিও দর্শককে আকৃষ্ট করেছে। এ সিনেমায় উত্তমের লিপে মান্না দে’র গানগুলো সময়কে অতিক্রম করেছে অনায়াসে। ‘বনপলাশির পদাবলী’ সিনেমার চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন উত্তম কুমার। তিনিই নায়ক উদাস চরিত্রের রূপকার। শক্তিপদ রাজগুরুর ‘নয়াবসত’ অবলম্বনে দ্বিভাষিক সিনেমা ‘অমানুষ’ করলেন শক্তি সামন্ত। সেখানে উত্তমের লিপে কিশোরকুমারের সব সাড়া জাগানো গান রয়েছে।
সত্যজিৎ রায় যখন ‘চিড়িয়াখানা’ তৈরি করলেন, তখন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট ব্যোমকেশ চরিত্রে ব্যবহার করলেন উত্তম কুমারকে। কী অপূর্ব যে মানিয়েছিল তাকে, তা বলে শেষ করা যাবে না। তপন সিংহ শরদিন্দুর ‘ঝিন্দের বন্দী’ নির্মাণের সময় উত্তম কুমারকেই বাছলেন দ্বৈত চরিত্রে (গৌরীশঙ্কর এবং শঙ্কর সিং)। এ নির্বাচন ছিল সঠিক। শরদিন্দুর ‘রাজদ্রোহী’র প্রতাপ চরিত্রেও অসাধারণ ছান্দিক অভিনয়ের পরিচয় দিলেন উত্তম কুমার। সুবোধ ঘোষের চারটি কাহিনির চিত্ররূপে ছিলেন তিনি। সিনেমাগুলো হলো—‘ত্রিযামা’, ‘শুন বরনারী’, ‘শিউলিবাড়ি’, ‘জতুগৃহ’। শেষোক্তটি উত্তম কুমার প্রযোজতি এবং তপন সিংহ পরিচালিত। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘উপহার’ এবং ‘আনন্দ আশ্রম’ সিনেমা দুটিতে উত্তম কুমার নায়ক। বিশ্বনাথ রায়ের দুটি কাহিনির চিত্ররূপেও তিনিই নায়ক- প্রথমটি ‘জীবন মৃত্যু’, দ্বিতীয়টি ‘কলঙ্কিত নায়ক’।
প্রতিভা বসুর তিনটি কাহিনিতে তিনি নায়ক। প্রথমটি হলো ‘পথে হল দেরী’, দ্বিতীয়টি ‘আলো আমার আলো’, তৃতীয়টি ‘শ্রীকান্তের উইল’। প্রথম দুটির জনপ্রিয়তা বলার অপক্ষো রাখে না। ওই দুটিতে উত্তমের সঙ্গে ছিলেন সুচিত্রা সেন। তবে এই জুটি নিয়ে প্রবোধকুমার সান্যালের ‘প্রিয় বান্ধবী’ জমেনি। এই জুটির এটিই শেষ সিনেমা। প্রফুল্ল রায়ের ‘এখানে পিঞ্জর’ এবং ‘বাঘবন্দী খেলা’ সিনেমা দুটিতে উত্তম কুমার দেখিয়েছেন অভিনয়কে কতটা উত্তুঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায়। বিমল করের ‘হ্রদ’, ‘রৌদ্রছায়া’ ও ‘যদুবংশ’ সিনেমার চিত্ররূপে উত্তম কুমার নানান ধরনের অভিনয় ধারা উপস্থাপন করেছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘সদানন্দের মেলা’, ‘হারজিৎ’, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’, ‘সাথীহারা’ ইত্যাদি উত্তম কুমারের সিনেমার সংখ্যা বাড়িয়েছে শুধু।
ড. নীহাররঞ্জন গুপ্তের ‘মায়ামৃগ’ সিনেমায় তিনি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করলেও ‘উত্তর ফাল্গুনী’ সিনেমাটির প্রযোজক তিনি। ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ সিনেমার তিনি পরিচালক ও অভিনেতা, ‘ছিন্নপত্র’-তে আবার দ্বৈত চরিত্রে (প্রতীপ ও আশীস), ‘রাতের রজনীগন্ধা’ ও ‘কাজললতায়’ তার বপিরীতে অভিনয় করেছেন অপর্ণা সেন। ‘বহ্নিশিখা’-তে দুর্ধর্ষ এক নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মহানায়ক উত্তম কুমার। বৈপরীত্য তার মজ্জায় মজ্জায়। বনফুলের ‘একটি রাত’ সিনেমায় তিনি সুশোভন, ‘অগ্নীশ্বর’ সিনেমায় তিনি ছিলেন নামভূমিকায়। একটিতে কমেডি চরিত্র, অপরটিতে চূড়ান্ত সিরিয়াস।
সমরেশ বসুর কাহিনির প্রথম চিত্ররূপ ‘কুহক’ থেকে শুরু করে ‘বিভাস’, ‘অপরিচিত’, ‘বিকেলে ভোরের ফুল’, ‘মৌচাক’ পর্যন্ত উত্তম কুমারই ছিলেন নায়ক। উত্তম-অপর্ণা জুটির প্রথম সিনেমা ‘অপরিচিত’। ‘মৌচাক’ সিনেমায় প্রশ্রয়দাতা রসিক দাদা নীতীশের চরিত্রে উত্তম কুমার ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এখানে উল্লেখ করার বিষয়টি হলো-উত্তম কুমার ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাধর একজন অভিনেতা। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পেলেও তিনি নিজেকে কখনো নির্দিষ্ট একটি চরিত্রের মধ্যে আটকে রাখেননি। বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে বারবার নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।
