হজের কোটা পূরণ নিয়ে ফের শঙ্কা, ওমরাহর প্রবণতা ও খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা
জীবনে পবিত্র হজ পালনের ইচ্ছা থাকলেও ২০২৭ সালের হজের জন্য এখন পর্যন্ত প্রাথমিক নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১ হাজার ২১৭ জন। ফলে বাংলাদেশ থেকে এবারও হজে যাওয়ার নির্ধারিত সংখ্যা বা কোটা অপূর্ণ থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই আশঙ্কার কারণ হিসেবে ওমরাহ পালনের প্রবণতা বেড়ে যাওয়া ও হজের খরচ বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ পোর্টালের তথ্যানুযায়ী, রোববার পর্যন্ত সরকারি মাধ্যমে ৫২৪ জন এবং বেসরকারি মাধ্যমে ৬৯৩ জন প্রাথমিক নিবন্ধন সেরেছেন।
একই সময়ে সরকারি মাধ্যমে হজে যেতে প্রাক-নিবন্ধন সেরেছেন ৩ হাজার ৫৯৩ জন। আর বেসরকারি মাধ্যমে প্রাক-নিবন্ধন করেছেন ৬০ হাজার ১২৯ জন।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ২০২৭ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, হজে গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট দিয়ে ৩০ হাজার টাকা ফি জমা দিয়ে প্রাক-নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়। এই প্রাক-নিবন্ধনের ক্রম অনুযায়ী জাতীয় তথ্যভান্ডারে স্থান নির্ধারণ করা হয়।
সৌদি আরবের হজ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুসরণ করে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধনের কার্যক্রম ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রম চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। যদিও প্রতিবছর নিবন্ধনের সময় বাড়ানো হয়।
প্রাক-নিবন্ধন ও প্রাথমিকভাবে নিবন্ধন করা ব্যক্তিদের আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে হজের চূড়ান্ত নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাক-নিবন্ধিতদের মধ্য থেকে নির্ধারিত ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়। এরপর নির্ধারিত প্যাকেজের অবশিষ্ট টাকা পরিশোধ করে চূড়ান্ত নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
সরকারি অথবা বেসরকারি অনুমোদিত হজ এজেন্সির মাধ্যমে—এই দুই পদ্ধতির যেকোনো একটি বেছে নিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।
বেড়েছে হজ প্যাকেজের মূল্য
গত ২১ জুলাই সচিবালয়ে সরকারি মাধ্যমে হজের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এবার হজের সর্বনিম্ন প্যাকেজের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা, যা গতবারের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি।
২০২৬ সালে সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজ ছিল ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকা। সে হিসাবে এবার হজের খরচ বেড়েছে ৩৮ হাজার ৫১১ টাকা।
তবে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দাবি, সার্বিক সেবা ও আনুষঙ্গিক খরচের হিসাব বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত চিত্র ভিন্ন।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ‘হজ প্যাকেজ ও নির্দেশিকা ২০২৭’ এবং প্রকাশিত ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালে সরকার ঘোষিত ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকার প্যাকেজে হজযাত্রীদের প্রতিদিনের খাবারের খরচ যুক্ত ছিল না। হাজিদের সেই টাকা নিজেদের উদ্যোগে খরচ করতে হতো।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সরকারি হজ প্যাকেজ-১ বা বিশেষ প্যাকেজের খরচ ছিল ৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৭ টাকা। ২০২৭ সালে তা কমিয়ে ৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে খরচ কমেছে ৭৫ হাজার ৩৩৪ টাকা।
এছাড়া বেসরকারি এজেন্সির জন্য সর্বনিম্ন মূল্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা।
হজের প্যাকেজ ঘোষণার একদিন পর ২২ জুলাই বেসরকারি মাধ্যমে তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এবার সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজের মূল্য ৫ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৫ টাকা।
দ্বিতীয় প্যাকেজের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৫৮০ টাকা এবং বিশেষ হজ প্যাকেজের মূল্য রাখা হয়েছে ৭ লাখ ৯১ হাজার ৬০ টাকা।
গত বছর বিশেষ হজ প্যাকেজের খরচ ছিল ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সাধারণ প্যাকেজের খরচ ৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা এবং সাশ্রয়ী প্যাকেজের খরচ ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। সে হিসাবে এবার সাশ্রয়ী প্যাকেজের ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার ৫৪৫ টাকা।
আর সাধারণ প্যাকেজের ব্যয় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২৭ হাজার টাকা বেশি।
কোটা পূরণ হচ্ছে না তিন বছর ধরে
২০২৫ ও ২০২৬ সালের মতো ২০২৭ সালেও বাংলাদেশের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রীর কোটা বহাল রেখেছে সৌদি আরব। তবে গত তিনবারের হজযাত্রায় এই কোটা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের কোটার বিপরীতে হজে গিয়েছিলেন ৭৮ হাজার ৫০০ জন। হজ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্য, হজ গাইডসহ সব মিলিয়ে ৭৯ হাজার ১০০ জন সৌদি আরব থেকে হজ পালন শেষে দেশে ফেরেন।
২০২৫ সালে হজ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যসহ ৮৭ হাজার ১০০ জন বাংলাদেশ থেকে হজ পালন করেন। আর ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৪ হাজার ৬৫৫।
কেন পূরণ হচ্ছে না কোটা?
কেন হজের কোটা পূরণ হচ্ছে না জানতে চাইলে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, “কোটা পূরণ না হওয়ার একটি বেসিক কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশের অনেক এজেন্সির দালালেরা মানুষকে ফুসলিয়ে ওমরাহ পালনে নিয়ে যায়। তারা ওমরাহ হজের নাম দিয়েছে ছোট হজ। অনেকেই ভাবে, ওমরাহ করলেই হজ পালন হয়ে যায়।
“দুই হজ তো এক নয়। গত বছর ৫ লাখ মানুষ ওমরাহ করেছেন। হয়তো ওমরাহ না করলে এর একটা বড় অংশ হজে যেতেন। তাতে আমাদের কোটা পূরণ হওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল। মূলত এ কারণেই হজের কোটা পূরণ হচ্ছে না।”
হজ প্যাকেজের খরচ বাড়াও কোটা পূরণে প্রতিবন্ধকতা কি না জানতে চাইলে ফরিদ বলেন, “খরচের বিষয়টা তো আছেই। এবার খাবারের খরচ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কিছুটা খরচ বেড়েছে। তবে খরচ বাড়লেও ওমরাহ হজ নিয়ে ভুল প্রচারই অন্যতম কারণ।
“আমরা চেষ্টা করছি। সরকার, আলেম ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে।”
কোটা পূরণ না হওয়ার ‘মূল কারণ’ হিসেবে কোভিড মহামারীর প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দাকে সামনে আনতে চান হাবের সাবেক মহাসচিব ও এয়ার টাচ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাওলানা ইয়াকুব শরাফতী।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “মন্দা পরিস্থিতির কারণে অনেকেই হজে যাওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছেন।
“এছাড়া অনেকে ফরজ হজ না করে নফল ওমরাহ পালনে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন, অথচ ওমরাহ কখনো হজের বিকল্প হতে পারে না।”
তিনি বলেন, “ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে শৈশব থেকেই হজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সঞ্চয়ের সরকারি ব্যবস্থা থাকায় তাদের কোটা সহজে পূরণ হয়, যা আমাদের দেশে নেই।”
এই পরিস্থিতি উত্তরণে হজ যে সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য একটি ফরজ ইবাদত, সে বিষয়ে জনগণের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলেও মত দেন তিনি।
হাবের সভাপতি সৈয়দ গোলাম সরওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, “অর্থনৈতিক যে অবস্থা, মানে মানুষের কাছে তো টাকা নাই, এক নম্বর। দুই নম্বর হলো, মানুষের একটা ধারণা হলো, তিন-চার লাখ টাকা দিয়ে হজ করবে। এখন তো সাড়ে পাঁচ লাখের নিচে হজই করতে পারবে না।
“মানুষের টাকা জোগাড় না হলে কীভাবে যাবে? মানুষের ইনকাম অনেক কমে গেছে। এজন্য হজে যাওয়া কমে গেছে। তারপরও এ বছর প্রাক-নিবন্ধন প্রায় ৬১ হাজার হয়ে গেছে। তো এখন সময় আছে, আরও এক মাস সময় আছে না? ৮০ হাজার থাকবে আশা করছি।”
হজে যেতে ইচ্ছুক অনেকেই বাড়তি খরচের কথা সামনে এনেছেন।
লক্ষ্মীপুরের রামগতির বাসিন্দা আবদুল হান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রত্যেক বছর নানা অজুহাতে হজের খরচ বাড়ে। আমরা হজে যাইতে পাইরতেছি না। আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করমু, ওইখানেও ব্যবসা করার জন্য বসি থাকে। হজের খরচটা যদি আরেকটু কম হইত, আমরা আল্লাহর ঘরটা তাওয়াফ করতে পাইরতাম।”
সরকারের ভাষ্য কী
হজের কোটা পূরণে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না জানতে চাইলে ধর্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ গণমাধ্যমকে বলেন, “পূরণ না হলে কোটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, সেটা ঠিক। তবে আমরা সরকারের তরফ থেকে চেষ্টা করছি কোটা পূরণে কাজ করার। এ নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে।”
সৌদি সরকার ঘোষিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে হজের ভিসা দেওয়া শুরু হবে এবং ৮ এপ্রিল শুরু হবে হজ ফ্লাইট। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৫ মে, অর্থাৎ ৯ জিলহজ হজ অনুষ্ঠিত হবে।
হজের জন্য সৌদি প্রান্তের খরচের অর্থ নুসুক মাসার মঞ্চের অর্থভান্ডারে সরাসরি স্থানান্তর কার্যক্রম চলবে এ বছরের ১৫ জুলাই থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছে, নুসুক মাসারের মাধ্যমে সামগ্রিক সেবা প্যাকেজ—তাঁবু, সেবা প্যাকেজ, মক্কা ও মদিনায় হোটেল, খাবার ও পরিবহন সেবা—নিতে চুক্তি স্বাক্ষর শুরু হয় ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই। এ কার্যক্রম শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৩ জানুয়ারি।
হজযাত্রীদের তথ্য নুসুক মাসার ব্যবস্থায় তুলে দিতে হবে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ২০২৭ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে।
আর হজযাত্রী পরিবহনকারী বিমান সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর ও নুসুক মাসারে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ সম্পন্ন করতে হবে চলতি বছরের ২৯ জুলাই থেকে ৮ নভেম্বরের মধ্যে।
সূত্র: বিডি নিউজ
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
