হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ করতে ফিজিওথেরাপি কতটা জরুরি


ডা. এম ইয়াছিন আলী

প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, কর্মক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই এই দিবসের অন্যতম লক্ষ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য‘হৃদরোগ ও স্ট্রোকের প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা’সময়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবার্তা বহন করছে।

হৃদরোগ ও স্ট্রোক শুধু বয়স্ক মানুষের সমস্যা নয়, পরিবর্তিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যেও এসব রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ এবং রোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা কেন ঝুঁকিপূর্ণ?

আধুনিক জীবনযাত্রায় অফিসে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, ব্যক্তিগত ও কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, যানবাহনের ওপর নির্ভরশীলতা এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব আমাদের শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে তুলছে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের অভাবে ওজন বৃদ্ধি, পেশিশক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং হৃদস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্ট ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, রোগের ইতিহাস ও ঝুঁকি বিবেচনা করে নিরাপদ ও কার্যকর ব্যায়াম কর্মসূচি তৈরি করতে পারেন। হাঁটা, অ্যারোবিক ব্যায়াম, পেশিশক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম, নমনীয়তা ও ভারসাম্য বৃদ্ধির অনুশীলন এবং দৈনন্দিন জীবনে সক্রিয় থাকার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে একজন মানুষকে আরও সক্রিয় জীবনযাপনে উৎসাহিত করা সম্ভব।

হৃদরোগের পর পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি

হৃদরোগের চিকিৎসার পর অনেক রোগীর শারীরিক সক্ষমতা কমে যায় এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ফিরে আসতে সময় লাগে। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন বা হৃদ্‌পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো যায়।

এ ধরনের পুনর্বাসনে রোগীর ব্যায়ামের সহনশীলতা, শারীরিক সক্ষমতা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে ফিরে যাওয়ার সক্ষমতা উন্নত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করা হয়। তবে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর ব্যায়াম অবশ্যই ব্যক্তিভেদে নির্ধারিত এবং প্রয়োজনে চিকিৎসক ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত।

স্ট্রোকের পর ফিজিওথেরাপি কেন জরুরি?

স্ট্রোকের পর শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, হাঁটতে সমস্যা, ভারসাম্যহীনতা, পেশির শক্ত হয়ে যাওয়া এবং হাত-পায়ের নড়াচড়ার সমন্বয় নষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে রোগী নিজের দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।

স্ট্রোকের পর উপযুক্ত সময়ে পুনর্বাসন শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে রোগীর নড়াচড়া, পেশিশক্তি, ভারসাম্য, হাঁটার সক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ করার দক্ষতা উন্নত করার চেষ্টা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বিছানা থেকে ওঠা, বসা, দাঁড়ানো, হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার এবং হাতের কার্যক্ষমতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্ট্রোক পুনর্বাসন শুধু রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়; বরং তাকে যতটা সম্ভব স্বাধীন ও আত্মনির্ভর করে তোলাই এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন জরুরি। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান পরিহার, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থাকা-এসব অভ্যাস হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক শক্তি

ফিজিওথেরাপিকে শুধু ব্যথা কমানো বা আঘাতের চিকিৎসা হিসেবে দেখলে এর ব্যাপক ভূমিকার একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। আধুনিক ফিজিওথেরাপি মানুষকে সক্রিয় রাখতে, শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে, অক্ষমতা কমাতে এবং রোগ-পরবর্তী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের সেই বার্তাই দেয়-সুস্থ হৃদয়, সক্রিয় শরীর এবং দ্রুত পুনর্বাসন-একটি সুস্থ সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

হৃদরোগ ও স্ট্রোকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও পরিবারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সচেতনতা, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং বৈজ্ঞানিক পুনর্বাসনের সমন্বয়ই পারে মানুষকে আরও দীর্ঘ, সক্রিয় ও স্বনির্ভর জীবনযাপনে সহায়তা করতে।

লেখক: চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালটেন্ট ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।

এসএকেওয়াই



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *