২০ বছর পর মামলার রায়, জেএমবির ২ সদস্যের ২০ বছর কারাদণ্ড
কুমিল্লায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা একটি আলোচিত মামলার প্রায় ২০ বছর পর রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। মামলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দুই আসামিকে ২০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক নারী আসামিকে ৮ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৬) আদালতের বিচারক খাইরুন নেছা এ রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন নওগাঁ জেলার মো. মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মিন্টু ওরফে সামাদ ওরফে রাজীব এবং গাজীপুরের শ্রীপুর থানার চকপাড়া এলাকার মোহাম্মদ দুরুল হুদা ওরফে হাসান। অপর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দুরুল হুদার স্ত্রী খালেদা আক্তার রানী।
মামলার সূত্রপাত ২০০৬ সালে: আদালত সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ১৩ মার্চ ২০০৬ তারিখে মামলা নম্বর-২১ দায়ের করা হয়। মামলাটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৪/৬ ধারায় দায়ের করা হয়। মামলার জিআর নম্বর-১০৬/০৬ এবং এসটি মামলা নম্বর-১৩৭/০৬। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৬ সালের মার্চে কুমিল্লার কোতোয়ালি থানাধীন বিষ্ণুপুর এলাকায় র্যাব-৭-এর একটি অভিযান পরিচালিত হয়। ওই অভিযানে একটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং বোমা তৈরিতে ব্যবহারের অভিযোগে বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধারের কথা মামলার এজাহার ও জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়।
বিষ্ণুপুরের সেই অভিযান: মামলার এজাহারে বলা হয়, র্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তারা ও সদস্যরা বিষ্ণুপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। তল্লাশির সময় সোডিয়াম সালফেট, লিড নাইট্রেট, সোডিয়াম নাইট্রেট, পটাসিয়াম ক্লোরাইড, সালফিউরিক অ্যাসিড, সালফার পাউডার, পটাসিয়াম ক্লোরেট, অ্যালুমিনিয়াম পাউডারসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ উদ্ধারের কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ইলেকট্রিক ডেটোনেটর, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক তার, সার্কিট, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, টেস্ট টিউবসহ বোমা তৈরির সরঞ্জাম হিসেবে মামলার নথিতে উল্লেখ করা বিভিন্ন আলামত জব্দের কথা বলা হয়েছে। মামলার নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, তৎকালীন র্যাবের হেফাজতে থাকা শায়খ আবদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিষ্ণুপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে এসব বিষয় ২০০৬ সালের এজাহার ও মামলার নথিতে উত্থাপিত তথ্য। মামলার বিচার শেষে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ দিয়েছেন।
১৩ সাক্ষীর সাক্ষ্য: মামলার বিচারিক কার্যক্রমে বাদী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে মোট ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আদালত সাক্ষীদের জবানবন্দি, আসামিদের বক্তব্য, জব্দ তালিকা এবং মামলার অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করেন। এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করেন।
দুই আসামির ২০ বছর, নারী আসামির ৮ বছর: রায় ঘোষণার সময় আদালত মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও মোহাম্মদ দুরুল হুদাকে প্রত্যেককে ২০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন। অন্যদিকে দুরুল হুদার স্ত্রী খালেদা আক্তার রানীকে ৮ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত খালেদা আক্তার রানীর সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার তিন সন্তান থাকা, তার স্বামী কারাগারে থাকা এবং তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকার বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন বলে মামলার রায়সংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগারে পাঠানো হয়েছে: রায় ঘোষণার পর সাজা পরোয়ানামূলে দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রয়োজনীয় পুলিশ পাহারায় প্রিজন ভ্যানযোগে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিদের আদালতে হাজির করা হয় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে। রায় ঘোষণার পর দুপুর ১টা ৫৬ মিনিটে তাদের কারাগারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় এবং দুপুর ২টা ৪ মিনিটে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছানো হয়।
২০ বছর পর আলোচিত মামলার নিষ্পত্তি: ২০০৬ সালের মার্চে কুমিল্লার বিষ্ণুপুর এলাকায় অভিযান ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলাটি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট রায়ের মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মামলার নথি অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ, আলামত ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনার পর আদালত তিন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে পৃথক মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন।
মামলার সূত্র: কোতোয়ালি মডেল থানার মামলা নং-২১, তারিখ ১৩/০৩/২০০৬; জিআর মামলা নং-১০৬/০৬; এসটি মামলা নং-১৩৭/০৬
কুশল/সাএ
