আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ৬টা বিশেষ মুহূর্ত
লাল কার্ড দিয়ে শুরু। মাঝপথে ছিল একের পর এক ফাইনালের হতাশা, এমনকি একবার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ও বলেছিলেন। তারপর প্রত্যাবর্তন। এরপর শিরোপা, বিশ্বকাপ, আরও এক ফাইনাল। শেষ পর্যন্ত ২০ বছরের বেশি সময়ের নীল-সাদা অধ্যায়ের ইতি টানলেন লিওনেল মেসি।
সোমবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার এই মহাতারকা। দেশের হয়ে দুই শতাধিক ম্যাচ খেলা মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থামল ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোল নিয়ে।
এই দীর্ঘ যাত্রার ৬টি বিশেষ মুহূর্ত আছে, যেগুলো মেসির ক্যারিয়ারকে সংজ্ঞায়িত করে। সেগুলোই তুলে ধরা হলো।
শুরুতেই লাল কার্ড
২০০৫ সালে ১৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক মেসির। হাঙ্গেরির বিপক্ষে বুদাপেস্টে সেই ম্যাচে মাঠে নামার মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখেন তিনি। বদলি হিসেবে নামা তরুণ মেসির জন্য অভিষেকটা তাই হয়ে থাকে ভুল কারণে স্মরণীয়। পরের বছরই অবশ্য বিশ্বকাপে দেখা যায় অন্য মেসিকে।
জার্মানি বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় তাঁর। ম্যাচের শেষ গোলটিও করেন মেসি। সেদিন শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের সঙ্গে তাঁর এক কিংবদন্তিতুল্য সম্পর্ক।
প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল
২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি তখন ২৬ বছরের। এরই মধ্যে বার্সেলোনার হয়ে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় সাফল্য তখনও অধরা।
২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়। ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার। এরপর ২০১১ সালে ঘরের মাঠে কোপা আমেরিকাতেও হতাশা।
ব্রাজিল বিশ্বকাপে আলেহান্দ্রো সাবেলার দলের অধিনায়ক মেসি অবশ্য শুরুটা করেন দুর্দান্তভাবে। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেন। পরে গোলের ধারা থেমে গেলেও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যান ১৯৯০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে। কিন্তু মারাকানায় জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় আর্জেন্টিনার।
২০১৬: সবচেয়ে কঠিন সময়
২০১৪-এর হতাশার পরের বছরই আবার ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। ২০১৬ কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওতে তাই মেসির লক্ষ্য ছিল একটাই, দেশের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জয়।
আর্জেন্টিনা আবারও ফাইনালে। প্রতিপক্ষ সেই চিলি। ভেন্যু নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম। ফলও বদলাল না। আবারও টাইব্রেকারে হার। এবার পরিস্থিতি আরও নির্মম, মেসি নিজেই পেনাল্টি মিস করেন।
ভেঙে পড়েছিলেন মেসি।
‘আমার জন্য জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ। আমি যা কিছু করতে পারি, সব করেছি। আমি চারটি ফাইনালে খেলেছি এবং চ্যাম্পিয়ন হতে না পারাটা খুবই কষ্ট দেয়।’ তবে সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। ছয় সপ্তাহ পরই সিদ্ধান্ত বদলে আবার আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে ফেরেন তিনি।
অবশেষে বিজয়
২০১৮ সালে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা কোচ হওয়া বদলে দেয় মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ২০২১ সালে কোভিড মহামারির মধ্যেই ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় মেসির আর্জেন্টিনা ওঠে ফাইনালে। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। এবার আর কোনো হতাশা নয়।
অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার গোলে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায় আর্জেন্টিনা। মেসিও পান তাঁর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। যে ট্রফির জন্য এতদিন অপেক্ষা, সেটি শেষ পর্যন্ত উঠেছিল তাঁর হাতেই।
কাতারে মুকুট
২০২২ বিশ্বকাপের পরই হয়তো ক্যারিয়ার শেষ করতে পারতেন মেসি। বয়স তখন ৩৫। খেলছিলেন পিএসজিতে। কিন্তু কাতারে যেন অন্য এক মেসিকে দেখা গেল।
সাত ম্যাচে সাত গোল এবং তিনটি অ্যাসিস্ট। আর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট, অতিরিক্ত সময়, সব মিলিয়েও যখন দুই দলকে আলাদা করা গেল না, ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেও নিজের পেনাল্টি থেকে গোল করেন মেসি।
শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ওঠে সেই ট্রফি, যেটি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হয়ে ছিল এতদিন। মেসি বলেন, ‘অবশ্যই আমি এটা নিয়েই ক্যারিয়ার শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাইতে পারি না।’
কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও থামেননি তিনি। আরও কিছুদিন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে চেয়েছিলেন মেসি। আর সেই ইচ্ছাই তাঁকে নিয়ে যায় আরও একটি বিশ্বকাপ পর্যন্ত।
আবারও ফাইনাল, এবার শেষটা বিষাদে
২০২৪ কোপা আমেরিকায় আবারও আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেন মেসি। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপ। রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামেন তিনি। ৩৯-এর কাছাকাছি বয়স। কিন্তু বয়সের প্রশ্নকে মাঠেই উড়িয়ে দেন মেসি। বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ ম্যাচেই করেন আট গোল। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যান টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৩৪ ম্যাচ খেলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়ও হন তিনি। তাঁর বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১।
তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হন মেসি। কিন্তু শেষটা হয়তো তাঁর কল্পনার মতো হয়নি। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির শেষ ম্যাচ তাই পরিণত হয় হতাশার রাতে।
আর সেই রাতের ছয় সপ্তাহ পরই এল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় মেসির।
শেষ হলো এক যুগ
ক্যারিয়ারের শুরুতে যে মেসি ছিলেন সাফল্যের জন্য অপেক্ষমাণ এক তরুণ, শেষদিকে তিনিই হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ফুটবলারদের একজন। একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপে কেঁদেছিলেন। অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আবার ফিরে এসেছিলেন। এরপর জিতেছেন সবকিছু।
এবার সত্যিই শেষ হলো সেই পথচলা।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না মেসিকে। থাকবে না তাঁর বাঁ পায়ের জাদু, থাকবে না গোলের পর সেই পরিচিত উদযাপন। থাকবে শুধু স্মৃতি।
