ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধে স্কুলে হামলা, প্রধান শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ
পাবনার চাটমোহরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বহিরাগতদের হামলা ও প্রধান শিক্ষককে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে পুলিশ।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে চাটমোহর উপজেলার শ্রীদাসখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
হামলায় দুজন আহত হয়েছেন। তাদেরকে চাটমোহর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তবে, রহস্যজনক কারণে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর পর্যন্ত উপজেলা শিক্ষা অফিস বা স্কুলের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
আহতরা হলেন— শ্রীদাসখালি গ্রামের জাবেদ আলীর ছেলে জিয়ারুল ইসলাম ও বেলালুর রহমানের ছেলে সোহাগ ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সরকারি বিধি মোতাবেক স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে জাহাঙ্গীর আলম ও কয়েকজনকে সদস্য বানিয়ে কমিটি গঠন করে অনুমোদনের জন্য শিক্ষা অফিসে পাঠান। বিষয়টি জানার পর ক্ষিপ্ত হয়ে চাটমোহর সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক শ্রীদাসখালি গ্রামের আব্দুল মালেক ও তার চাচাতো ভাই আবু সাঈদ (সাবেক সভাপতি) প্রতিবাদ জানান।
শুধু তাই নয়, আব্দুল মালেককে সভাপতি বানানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করেন আবু সাঈদ। কিন্তু, সরকারি নির্দেশনার বাইরে যাবেন না বলে প্রধান শিক্ষক জানালে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। সোমবার অভিযোগের তদন্তে ওই স্কুলে যান সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম ও আসলাম উদ্দিন।
দুই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই আব্দুল মালেক ও আবু সাঈদের নেতৃত্বে শতাধিক বহিরাগত মানুষ স্কুলে হামলা চালান এবং প্রধান শিক্ষককে অফিস কক্ষ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন। প্রধান শিক্ষককে মারধর করা দেখে স্থানীয় কয়েকজন বাধা দিতে গেলে বহিরাগত লোকজনের মারধরে দুজন আহত হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। প্রধান শিক্ষককে মারধর ও শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উপজেলাজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। পাশাপাশি স্কুলে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করেন অভিভাবক থেকে শুরু করে স্থানীয় সাধারণ মানুষ। তবে, রহস্যজনক কারণে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ দেয়নি উপজেলা শিক্ষা অফিস বা ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক।
মারধরের শিকার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেছেন, “ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তারা দীর্ঘদিন ধরে আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। সরকারি নীতিমালার বাইরে আব্দুল মালেক নামের একজনকে সভাপতি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু, আমি সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করে কমিটির প্রস্তাব জমা দেই।”
তিনি বলেন, “আব্দুল মালেক কলেজের প্রভাষক। তিনি শিক্ষক হয়ে কীভাবে এভাবে বহিরাগত লোকজন এনে হামলা ও আমাকে মারধর করতে পারেন? আবু সাঈদ এর আগে এই স্কুলের সভাপতি ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে স্কুলে বহিরাগতরা হামলা চালিয়েছে। এটিইও স্যারদের সামনে আমাকে খুব মারধর করেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
স্কুলে হামলার সময় উপস্থিত সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা দুজন অফিসার গিয়েছিলাম অভিযোগের তদন্ত করতে। কিন্তু, সংঘবদ্ধ হয়ে লোকজন এসে স্কুলে হামলা করবে বা প্রধান শিক্ষককে মারধর করবে, এটা ভাবতেই পারিনি। সেই সময় স্কুলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”
অভিযুক্ত প্রভাষক আব্দুল মালেক বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমাকে দাতা সদস্য থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা ইউএনও স্যারের কাছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলাম। সেটার তদন্ত ছিল সোমবার। সেখানে আমি কাগজপত্র দেখাতে গিয়েছিলাম। এই ঘটনার সাথে আমি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল গণি বলেন, “স্কুলে হামলা ও প্রধান শিক্ষককে অফিসারের সামনে মারধর করবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
চাটমোহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অলিউর রহমান বলেছেন, “বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে, সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
