আপাত মনে হতে পারে, আমি আপনাদের সামনে মাইক্রোফোনে কথা বলছি, কিন্তু বাস্তবে আমি আছি আমার সেই টাওয়ার ঘরে, আর আপনারা জানেন যে সেই ঘরটি তাপরোধী নরওয়েজীয় সস্তা স্প্রুস কাঠে তৈরি এবং বেশ সাদামাটা
২.
আচ্ছা, অ্যাঞ্জেলদের কথা যথেষ্ট হয়েছে, এবার বরং মানুষের মর্যাদা নিয়ে আলাপ করা যাক—
মানুষ—বিস্ময়কর সৃষ্টি—কে তুমি? তুমি চাকা আবিষ্কার করেছ, তুমি আগুন আবিষ্কার করেছ, আর উপলব্ধি করেছ—তোমার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় পারস্পরিক সহযোগিতা এবং তুমিই আবিষ্কার করেছিলে মৃতভোজিতা (মৃতদেহ ভক্ষণের কৌশল) যাতে এই পৃথিবীর ওপর তোমার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারো, আর তুমিই অর্জন করতে পেরেছ বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা, আর তোমার রয়েছে মস্ত এক মস্তিষ্কও—বহুস্তরবিশিষ্ট, জটিল, আর এ ব্রেনের জোরেই তুমি এত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছ জীবজগতে—যদিও তার একটা সীমা রয়েছে এ পৃথিবীতে, যে পৃথিবীর নামটিও তোমরাই দিয়েছ, তোমাদের এই শক্তিই কিছু স্বীকৃত সত্যের দিকে নিয়ে গিয়েছিল যার অধিকাংশই পরে ভুল প্রমাণিত হয়, তবে সেগুলো তোমাদের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতেও সহযোগিতা করেছিল।
তোমার বিকাশ, তোমার ক্রমাগত অগ্রগতি পৃথিবীতে তোমার প্রজাতিকে শক্তিশালী করেছে, স্থিতিশীল করেছে, আর তোমরা সংখ্যায় বাড়তে থাকলে, সুবিশাল দলে পরিণত হতে থাকলে, তোমরা সমাজ গড়ে তুললে, সভ্যতা নির্মাণ করলে, এমনকি পৃথিবী থেকে যাতে তোমাদের পুরো প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে না যায়, তার অলৌকিক ক্ষমতা-কৌশলও আয়ত্ত করলে—যদিও তোমাদের বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল, কিন্তু না, তোমরা তোমাদের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালে, তারপর একসময় হোমো হ্যাবিলিস প্রজাতিতে রূপ নিলে এবং পাথর কেটে বিভিন্ন হাতিয়ার বা সরঞ্জাম বানাতে শিখলে, এবং তোমরা সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটাও রপ্ত করলে; তারপর একসময় তোমরা হোমো ইরেক্টাস মানুষে পরিণত হলে, আগুন আবিষ্কার করলে, এরপর ছোট্ট একটা পরিবর্তন দেখা যায় তোমাদের মধ্যে—তোমাদের স্বরযন্ত্র ও নরোম তালুর মধ্যে পরস্পরকে স্পর্শ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে, অথচ তখনো শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনাটাই ঘটত, আর এ কারণেই তোমাদের বাক্কেন্দ্রের বিকাশের পাশাপাশি ভাষাও সৃষ্টি হতে থাকল, আর ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী দেখা যায়, তোমরা স্বর্গপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে; এবং তিনি তার সৃষ্ট সবকিছুর নাম দিতে বললেন তোমাদের, আর তোমরা সেসবের নামও দিয়েছিলে, তারপর একসময় তোমরা লিখনপদ্ধতি আবিষ্কার করলে, তবে তত দিনে তোমরা দার্শনিক চিন্তাভাবনা করার সক্ষমতাও অর্জন করে ফেলেছিলে; প্রথমে তোমরা বিভিন্ন ঘটনাকে একই সুতায় বাঁধতে শিখলে, তারপর ধীরে ধীরে সেগুলোকে তোমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে আলাদা করতে থাকলে, নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে আবিষ্কার করলে সময়, তৈরি করলে বিভিন্ন যানবাহন আর জলযান, পৃথিবীর অজানা সব জায়গায় ঘুরে বেড়ালে আর যা কিছু লুণ্ঠন ও তছরুপ করা সম্ভব তার সবই করলে, যেহেতু তোমরা বুঝতে পেরেছিলে শক্তি ও ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার মানেটা আসলে কী, যেসব গ্রহ একসময় অধরা-অজানা ছিল সেসবের মানচিত্রও তোমরা আঁকলে; তত দিনে তোমরা সূর্যকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে এবং তারাপুঞ্জকে ভাগ্যনির্ধারক হিসেবেও মানা বাদ দিলে; তোমরা যৌনতাকে আবিষ্কার করলে, এরপর নানা রূপে একে বদলেও দিলে—নারী-পুরুষের ভূমিকায়ও আনলে নানা পরিবর্তন, এরপর দেরিতে হলেও আবিষ্কার করলে ভালোবাসা, অনুভূতি, সহানুভূতি, আর গড়ে তুললে জ্ঞান অর্জনের নানা স্তর ও শ্রেণিবিন্যাস, এবং অবশেষে তোমরা মহাকাশে উড়াল দিলে পাখিদের পেছনে ফেলে, তোমরা পৌঁছে গেলে চাঁদে এবং মহাশূন্যে তোমাদের প্রথম পদচিহ্নটি সেখানেই রাখলে, তারপর তোমরা এমন সব অস্ত্র আবিষ্কার করতে শুরু করলে যা পুরো পৃথিবীকে কয়েকবার ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে।
