আড়াই বছরেও জোড়া লাগেনি হাড়, ম্যানেজ করেই খেলতে হবে বর্ষণকে


চোট পুরোপুরি সেরে ওঠার অপেক্ষায় এক-দেড় বছর বসে থাকা কিংবা অস্ত্রোপচার করে আরও এক বছর মাঠের বাইরে থাকা; দুটির কোনোটিই বেছে নিতে চাননি তরুণ পেসার রোহানাত দৌলা বর্ষণ। অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসকের কাছ থেকে পাওয়া তিনটি বিকল্পের মধ্যে ২১ বছর বয়সী এই পেসার বেছে নিয়েছেন তৃতীয় পথটি-চোটকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া।

পিঠের স্ট্রেস ফ্র্যাকচার নিয়েই খেলতে হবে বর্ষণকে। চাপ বাড়লে ব্যথা ফিরে আসতে পারে, আবার কয়েক দিন বিশ্রাম নিলে সেটি কমেও যাবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আপাতত এভাবেই পরিস্থিতি সামলে এগোতে চান তিনি। আর গত এক-দেড় সপ্তাহ বিশ্রামের পর এখন নিজেকে বোলিং করার মতো অবস্থাতেই মনে করছেন বর্ষণ।

জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে বর্ষণ বলেন, ‘এখন ভালো বোধ করছি, বোলিং করার মতোই। গত এক-দেড় সপ্তাহ বিশ্রাম নেওয়ার পর এখন আবার বোলিং করার মতো ফিটই মনে হচ্ছে।’

অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি খেলতে গিয়ে পুরোনো পিঠের ব্যথা ফিরে আসার পর সেখানকার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন বর্ষণ। স্ক্যান করানোর পর বড় কোনো নতুন সমস্যা পাওয়া যায়নি। কিন্তু আগের স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের জায়গায় হাড় এখনো পুরোপুরি জোড়া লাগেনি। এই অবস্থায় চিকিৎসক তার সামনে তিনটি বিকল্প রাখেন।

jagonews

প্রথমটি ছিল ক্রিকেট থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা। সময়টা কম নয়, এক থেকে দেড় বছর। কিন্তু এতদিন বিশ্রামে থাকলেই যে হাড় নিশ্চিতভাবে জোড়া লেগে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ এরই মধ্যে দুই থেকে আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও বর্ষণের হাড় পুরোপুরি জোড়া লাগেনি।

এই অনিশ্চয়তাই দীর্ঘ বিশ্রামের পথে যেতে তাকে নিরুৎসাহিত করেছে। বর্ষণের ভাষায়, এতটা সময় ক্রিকেটের বাইরে থেকে শেষ পর্যন্ত উন্নতির নিশ্চয়তা না থাকলে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তার জানা, এমন চোট নিয়েও অনেক বোলার পরবর্তী সময়ে ক্রিকেট খেলেছেন।

দ্বিতীয় বিকল্প ছিল অস্ত্রোপচার। সেটি করালে ন্যূনতম এক বছর মাঠের বাইরে থাকতে হবে। আপাতত সেই পথেও যেতে চান না বর্ষণ।

জাগো নিউজকে বর্ষণ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার তিনটা অপশন দিয়েছে। এক থেকে দেড় বছর পুরোপুরি বিশ্রাম, এটা একটা অপশন। কিন্তু দুই থেকে আড়াই বছর হয়ে গেলেও হাড় পুরোপুরি জোড়া লাগেনি। ফলে এই গ্যাপটা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এক থেকে দেড় বছর বাইরে থাকলেও উন্নতির নিশ্চয়তা নেই। এত লম্বা সময় নষ্ট করতে চাই না। দ্বিতীয় অপশন সার্জারি। যেটা করলে মিনিমাম এক বছর বাইরে থাকতে হবে। আমি এটাতেও রাজি নই।’

jagonews

তৃতীয় বিকল্পটাই তাই বর্ষণের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। সেটি হলো, শরীরের ওপর চাপের মাত্রা বুঝে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া। ব্যথা বাড়লে বিশ্রাম, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার মাঠে ফেরা। চিকিৎসকের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চোট সামলে খেলার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে ২৩ বছর বয়স পার করার পর হাড় ধীরে ধীরে জোড়া লাগার সম্ভাবনা রয়েছে বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন বর্ষণকে। একই সঙ্গে এই চোটকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে শরীরের ওপর চাপ সামলাতে হবে, সেই সক্ষমতাও বয়সের সঙ্গে বাড়বে।

বর্ষণ বলেন, ‘তৃতীয় অপশন হচ্ছে এভাবেই খেলে যাওয়া। যখন চাপ বেশি পড়বে ব্যথাটা ফিরে আসবে। কয়েকদিন বিশ্রাম নিলে আবার ঠিক হয়ে যাবে। এই যেমন গত এক-দেড় সপ্তাহের বিশ্রামে আবার বোলিংয়ের জন্য ফিট হয়ে গেছি। ডাক্তার বলেছেন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এটা সামলানোর দক্ষতাটা বাড়বে। ২৩ বছর পার হলে জোড়াটাও আস্তে আস্তে জোড়া লেগে যেতে পারে। আর এটা সঙ্গে করে খেলার জন্য ক্যাপাবিলিটিও বাড়বে।’

তবে এই মুহূর্তে পুরোপুরি বিশ্রামেই থাকছেন বর্ষণ। আগামী দুই মাস তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ও জিম সেশন চলবে। রানিংসহ নির্দিষ্ট ফিটনেস কার্যক্রমও থাকবে সেই পরিকল্পনায়। লক্ষ্য, শরীরকে সচল রেখে ধীরে ধীরে আবার বোলিংয়ের চাপ নেওয়ার মতো অবস্থায় যাওয়া।

বিসিবির মেডিকেল বিভাগও বিষয়টিকে দেখছে ‘ম্যানেজ করে খেলা’র দৃষ্টিতে। তাদের মতে, হাড় পুরোপুরি জোড়া না লাগা পর্যন্ত ব্যথা মাঝে মাঝে ফিরে আসতে পারে। কখনো সেটি বাড়বে, কখনো কমবে; তখন প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম দিয়ে আবার ক্রিকেটে ফেরাতে হবে বর্ষণকে। অস্ট্রেলিয়ার স্ক্যানেও হাড় পুরোপুরি জোড়া না লাগার বিষয়টি ধরা পড়লেও রিপোর্ট ভালো ছিল।

jagonews

বিসিবির মেডিকেল বিভাগের একটি সূত্র বলেছে, ‘ওকে ম্যানেজ করেই খেলতে হবে। হাড় জোড়া না লাগলে ব্যথা মাঝেমধ্যে ফিরবে, বাড়বে আবার কমবে। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে খেলতে হবে। মানে ম্যানেজ করে খেলতে হবে। তবে জোড়া লেগে গেলে সমস্যা হবে না। কিন্তু অনেকদিন হয়ে গেলেও জোড়া লাগেনি। অস্ট্রেলিয়ায় করা স্ক্যানেও জোড়া না লাগার বিষয়টি এসেছে, তবে রিপোর্ট ভালো ছিল।’

এই চোটের কারণে আপাতত বর্ষণকে মূলত টি-টোয়েন্টির ক্রিকেটার হিসেবেই ভাবা হচ্ছে। লাল বলের ক্রিকেটে ফেরার বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না বিসিবি। আগে তাকে পুরোপুরি ফিট হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে হবে, এরপর দীর্ঘ সংস্করণে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

নির্বাচক প্যানেলের এক সদস্য বলেন, ‘আগে ফিট হয়ে ফিরুক। এরপর লাল বলে বিবেচনা করা হবে কিনা, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

বর্ষণের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে। প্রায় ১৫ মাসের চোট কাটিয়ে এ বছর ক্রিকেটে ফিরেই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে নজর কেড়েছিলেন তিনি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় এইচপি দলের হয়ে ওয়ানডে সিরিজে ১২ উইকেট নিয়ে নিজের প্রত্যাবর্তনকে আরও উজ্জ্বল করেন।

সেই পারফরম্যান্সের পর অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে খেলার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু পুরোনো পিঠের ব্যথা আবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখন দুই মাসের রিহ্যাবের পর ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার প্রস্তুতি নেবেন বর্ষণ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বাংলাদেশ ফাস্ট টুর্নামেন্ট দিয়ে মাঠে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে তার। 

কম বয়সে যারা দ্রুত গতিতে বোলিং করে, তাদের স্ট্রেস ফ্র্যাকচার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। বিশ্বের অনেক নামিদামি ফাস্ট বোলারই এই সমস্যায় ভুগেছেন। প্যাট কামিন্সের ২০১০ সালে অভিষেক হলেও চোটের কারণে পরের টেস্ট খেলতে তার প্রায় ৫-৬ বছর লেগে যায়। এছাড়া কাগিসো রাবাদা, জোফরা আর্চার, জাসপ্রীত বুমরাহ, নরকিয়া, আলজারি জোসেফ, মিচেল স্টার্কদের মতো বোলাররাও এই চোটে ভুগেছেন। 

jagonews

ফাস্ট বোলিংয়ে প্রতিটি ডেলিভারি করার সময় বোলারের শরীরের নিচের অংশে তার ওজনের প্রায় ১০ গুণ পর্যন্ত চাপ পড়ে। যে যত বেশি গতিতে বল ডেলিভারি করে, তার শরীরে তত বেশি লোড বা চাপ সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৩০-১৩৫ কিমি/ঘণ্টা গতিতে বোলিং করলে ইনজুরির ঝুঁকি কম থাকলেও গতি ১৪০-১৪৫+ কিমি/ঘণ্টায় নিয়ে গেলে শরীরের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়। বর্ষণের ক্ষেত্রেও এখন সেটাই হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ওয়ার্ম-আপ ম্যাচে ১৪৫+ কিমি/ঘণ্টা গতিতে বল করে ৪টি উইকেট নেন বর্ষণ। এতে অতিরিক্ত লোড পড়ায় তার ব্যথা ফিরে আসে। এগুলো সামলাতে হলে বডি স্ট্রেন্থ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

এসকেডি/এমএমআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *