কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দী বিধবার সংসার, দুই বছর নেই পানি বিদ্যুৎ
চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া। বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ নেই। ঘর থেকে বাইরে যেতে হলে মই বেয়ে দেয়াল টপকাতে হয়। নেই বিদ্যুৎ, নেই পানির সংযোগ। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আনতেও পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। সবসময় আতঙ্ক- কখন বুলডোজার এসে ভেঙে দেয় শেষ আশ্রয়।
এভাবে প্রায় দুই বছর বসতবাড়িতে অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেন গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামের শামসুন্নাহার বেগম (৫০)। স্বামী আমিরুল ইসলাম মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। একমাত্র ছেলে সাইফুল ইসলাম দিপুকে নিয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া বসতভিটাতেই কোনোভাবে দিন পার করছেন তিনি।
শামসুন্নাহারের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী নূরুল হুদার লোকজন বসতবাড়ির চারপাশে বাঁশ, কাঠ ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে তাদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। বসতভিটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রাতে বুলডোজার দিয়ে ঘর ভেঙে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হচ্ছে বলে দাবি তার।
কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন শামসুন্নাহার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, দুই বছর ধরে আমি ঘরবন্দী। বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। মই বেয়ে দেয়াল টপকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। চারপাশে বাঁশ, কাঠ আর কাঁটাতারের বেড়া। এক ইঞ্চি জায়গাও খোলা নেই। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মিটার পর্যন্ত নিয়ে গেছে। পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই—এভাবে কীভাবে বেঁচে আছি, তা আমরাই জানি।
তার দাবি, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও এখনো কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বসতভিটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকির মাত্রা দিনদিন বাড়ছে। কয়েক দফা হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। আমি কি বাংলাদেশের মানুষ নই? গরিব বলে কি আমার চলাচলের রাস্তা থাকবে না, বিদ্যুৎ থাকবে না, পানি থাকবে না?
শামসুন্নাহারের ছেলে সাইফুল ইসলাম দিপু বলেন, বসতভিটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য গত দুই বছর ধরে আমাদের ওপর নানা ধরনের চাপ ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে। ২০০৫ সালে বাবা নিজের কষ্টে উপার্জন করা টাকা দিয়ে সাড়ে ৩ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। আজ সেই জমির মূল্য কোটি টাকা। এ কারণেই প্রভাবশালীদের লোভ পড়েছে বাড়ির ওপর। কিন্তু মা-বাবার কষ্টে কেনা বসতভিটা আমরা ছাড়ব না।
দিপু বলেন, নূরুল হুদা আমাদের বলেছেন, বুলডোজার দিয়ে বসতবাড়ির কোনো চিহ্ন রাখা হবে না। ডিসি, এসপিসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেছি, শুধু চলাচলের জন্য একটু রাস্তা চেয়েছি। কিন্তু এখনো কেউ কার্যকরভাবে এগিয়ে আসেনি।
অভিযোগের বিষয়ে নূরুল হুদা বলেন, চারপাশে মালিকের জমি। তাই বেড়া দেওয়া হয়েছে। মালিক যেভাবে হুকুম করবে, আমরা সেভাবেই কাজ করি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। মারধরের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে রাস্তা খুলে দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের কাজ বলে জানান তিনি।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ ভূঁইয়া বলেন, বিষয়টি এখনো সমাধান হয়নি। সমাধানের চেষ্টা চলছে।
