এক্সপ্রেসওয়েতে লাশ: বাসের সুপারভাইজার ও সহকারীর স্বীকারোক্তি, চালক রিমান্ডে
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামে একটি বাসের যাত্রী ইসমাইল হোসেনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় ওই বাসের সুপারভাইজার সাজু লস্কর ও সহকারী মাহবুব আলম মনির ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দিয়েছেন। পাশাপাশি বাসচালক সোহেল রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
রোববার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার এসআই নজরুল ইসলাম তালুকদার তিন আসামিকে আদালতে হাজির করেন। সাজু ও মনির ‘স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায়’ তা রেকর্ড করার এবং সোহেল রানার সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর আসামি সাজুর এবং আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ছিদ্দীক আজাদ আসামি মনিরের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত শুনানি নিয়ে সোহেলের চার দিনের রিমান্ড দেয় আদালত।
প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই মোক্তার হোসেন এসব তথ্য দেন।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে শুক্রবার সকালে নাম না জানা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন মরদেহের মুখে টেপ মারা ছিল, পরনে ছিল অটোরিকশা চালকদের ইউনিফর্মের মত নীল রঙের শার্ট আর লুঙ্গি।
তার আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে শনিবার পুলিশ জানতে পারে, ৫০ বছর বয়সি ওই ব্যক্তির নাম ইসমাইল হোসেন। তিনি জামালপুর সদর উপজেলার জালাল উদ্দিনের ছেলে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার লাশ শনাক্ত করে ইসমাইলের ছেলে হাসান।
পুলিশের ভাষ্য, শুক্রবার ইসমাইল হোসেন জামালপুর থেকে গাজীপুরে আসার জন্য বাসে উঠেছিলেন; মাঝপথে ভাড়া দেওয়ার সময় তার কাছে মোটা অংকের টাকা থাকার বিষয়টি টের পেয়ে গিয়েছিল বাসটির সুপারভাইজার।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, “বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ওঠানামা করে জামালপুর থেকে ঢাকা আসার পথে এক পর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু ইসমাইলের কাছ থেকে ভাড়া চান। ইসমাইল লুঙ্গিতে গুঁজে রাখা টাকা বের করে ভাড়া দিয়েছিলেন। তখন তার কাছে বেশি পরিমাণ টাকা থাকার বিষয়টি খেয়াল করেন সাজু।
“পরবর্তীতে বাস চালককে বিষয়টি অবহিত করে যে, এই ব্যক্তির কাছে অনেক টাকা আছে। সে কোনো বেপারী হতে পারে, সুতরাং তার কাছে আরো টাকা পাওয়া যেতে পারে ধারণা করে তারা। পরে চালক তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করে।”
সে অনুযায়ী বাসটি চন্দ্রা বাস স্ট্যান্ডে ইসমাইলকে না নামিয়ে বাসের অন্যান্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেয়। ইসমাইলকে নিয়ে বাসটি ঢাকার দিকে আসতে থাকে।
“এক পর্যায়ে সুপারভাইজার এবং সহাকারী মিলে ইসমাইলের মুখ এবং হাত টেপ দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং গামছা পেঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।”
ঘটনার পরদিন শনিবার রাতে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের ওই বাসটি শনাক্তের পর জব্দ করে পুলিশ। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় বাসের চালক সোহেল রানা, সুপারভাইজার সাজু এবং বাসের সহকারী মনিরকে।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, গেল ৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে ইসমাইল হোসেন জামালপুর থেকে গাজীপুরের বাসায় আসার জন্য রওনা দেন। গ্রামের বাড়ির জমি বিক্রির নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য তার সঙ্গে ছিল। ইসমাইলের আসার খবরে ছেলে মো. হাসান গাজীপুর জিরানী বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে থাকেন। বাবার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর কল দিয়েও বন্ধ পান। পরে সকাল ১০ টা পর্যন্ত জিরানি বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করে বাসায় চলে যান।
“দুপুর ১২ টার দিকে ঢাকার বনানী থানা থেকে প্রতিবেশী মন্টুকে ফোন করে জানানো হয়, ইসমাইল হোসেনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। পরে মৃতদেহের ছবি দেখে বাবাকে শনাক্ত করেন ছেলে হাসান। তিনি জানতে পারেন, বনানী থানাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী থেকে কুড়িলগামী রাস্তার ১৭৯ ও ১৮০ নং পিলারের মধ্যবর্তী এক্সপ্রেসওয়েতে তার বাবাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কিন্তু সঙ্গে থাকা ৫ লাখ টাকা ও গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা কোন মালামাল পাওয়া যায়নি। ইসমাইলে শরীরে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়া নাক, মাথা ও ডান হাতের কবজিতে টেপ মারা ছিল।”
এ ঘটনায় হাসান বাদী হয়ে ৪ সেপ্টেম্বরই বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
