সাভারে গ্যারেজ মালিককে মারধরের প্রতিবাদ করায় এসবি সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা
ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে সড়কের ওপর অটোরিকশা রাখা নিয়ে গ্যারেজ মালিককে মারধরের প্রতিবাদ করায় পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের সদস্য আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় তার ছেলে আরিফুল ইসলামও গুরুতর আহত হয়েছেন।
শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় এসবি কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন (৫৮) ও তার ছেলে আরিফুল ইসলামকে (২৬) তাদেরই একটি গেঞ্জি কারখানায় ঢুকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “এটি কোনো ‘মব’ ঘটনার রূপ নয়। পুলিশ সদস্য আলতাফ হোসেন নামাজে যাওয়ার পথে এক রিকশা গ্যারেজের মালিককে মারধর করতে দেখে এগিয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। এ সময় সন্ত্রাসীরা তার ওপর চড়াও হয়। তিনি আত্মরক্ষার্থে পাশে ছেলের কারখানায় ঢুকে পড়েন। তখন সেখানে ঢুকে বাবা-ছেলে দুজনকেই মারধর করা হয়। পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
এ ঘটনায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী শিউলি বেগম বাদী হয়ে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন। হামলায় জড়িত মূলহোতা প্রাইভেট কার চালক জহিরুল ইসলামকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত আলতাফ হোসেন এসবির মালিবাগ শাখায় কর্মরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর (এনায়েতপুর) উপজেলার সাধুপাড়া গ্রামে। পরিবার নিয়ে তিনি সাভারের আমিনবাজারেই বসবাস করতেন।
অটোরিকশা সরানো নিয়ে বাকবিতণ্ডার সূত্রপাত
রোববার সরেজমিনে আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি মসজিদের পশ্চিম পাশে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্যারেজ মালিক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে প্রাইভেট কারে আসা চার ব্যক্তির বাদানুবাদ থেকে ঘটনার সূত্রপাত ঘটে।
মসজিদের সামনের সড়কে রিকশা রেখে চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগে প্রাইভেট কারে থাকা ব্যক্তিরা আবুল কালামকে চড়-থাপ্পড় মারেন। পাশেই থাকা এসবি কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন এগিয়ে এসে প্রতিবাদ জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তারা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, “আলতাফ ভাই নামাজের জন্য আসছিলেন। গ্যারেজ মালিককে মারতে দেখে তিনি বললেন, ‘উনাকে মারছেন কেন?’ তখন ওরা বলে, ‘তুই কে?’ বলেই তাকে ধরে ফেলে। এটা অত্যন্ত জঘন্য ঘটনা, আমরা এর কঠোর বিচার চাই।”
গ্যারেজ মালিকের ছেলে বলেন, “আমার বাবাকে যখন মারা হচ্ছিল, তখন ওই আঙ্কেল এসে কারণ জানতে চান। তখন আব্বুকে ছেড়ে দিয়ে ওনার ওপর হামলা করে। উনি নিজেকে পুলিশের লোক পরিচয় দেওয়ার পরও উনাকে মারে। উনি মাটিতে পড়ে যান এবং উঠে দৌড়ে আত্মরক্ষার্থে নিজ কারখানায় ঢুকলে সেখানে গিয়েও উনাকে ও ওনার ছেলেকে মারে।”
ছেলের কারখানায় ঢুকে তাণ্ডব
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মসজিদ থেকে প্রায় ৭৫ গজ দূরে নিজের ছেলে আরিফুল ইসলামের মিনি গেঞ্জি কারখানায় আশ্রয় নেন আলতাফ হোসেন।
হামলাকারীরা পিছু ধাওয়া করে কারখানার ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানে লাঠি দিয়ে আলতাফ হোসেন ও তার ছেলের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয় এবং কারখানাটিতে ভাঙচুর চালানো হয়।
পরে স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত ৯টা ১৮ মিনিটে চিকিৎসক আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
শনাক্ত ১২, মূলহোতা গ্রেপ্তার
ঘটনার পর সাভার থানা-পুলিশ ও পিবিআই তদন্ত শুরু করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ১২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, প্রাইভেট কারটির চালক জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় মোসলেম উদ্দিনের ছেলে।
ওসি বলেন, “যাকে নিয়ে দ্বন্দ্বে ঘটনার সূত্রপাত, সেই জহিরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে মোট ১২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ১১ জনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ সোলাইমান গাজী জানান, পিবিআইর একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ছায়াতদন্ত শুরু করেছে।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
