কিশোরগঞ্জে সালিশের রায় না মানায় ২১ দিন ধরে একঘরে ২০ সদস্যের পরিবার
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সালিশের রায় না মানায় ২০ সদস্যের একটি পরিবারকে একঘরে করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন মাতব্বরের বিরুদ্ধে। গত ২১ দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এলাকার কেউ যোগাযোগ না করায় বিপাকে পড়েছেন তারা।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে গ্রামের সালিশে দেওয়া সিদ্ধান্ত না মানায় তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে। এমনকি পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বললে, তাদের অটোরিকশায় উঠলে কিংবা আয়-রোজগারের কাজে সহযোগিতা করলেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য হবি মিয়া ও রফিক মিয়া বাজিতপুর উপজেলার হিলচিয়া ইউনিয়নের বেলভিডা দক্ষিণ সাতুঢা গ্রামের মৃত ভেলু মিয়ার ছেলে। স্থানীয় প্রভাবশালী সালিসকারীদের সিদ্ধান্তে একঘরে হয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাদের পরিবারের ২০ সদস্য।
হবি মিয়ার দাবি, প্রতিবেশী সেলিম ও শাহিনের সঙ্গে তাদের প্রায় দেড় শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। তারা ওই জমি বিক্রি করেননি এবং জমি বিক্রির বিনিময়ে কোনো টাকাও নেননি। তবে সেলিম ও শাহিনের দাবি, তারা হবি ও রফিকের কাছ থেকে দেড় শতাংশ জমি কিনেছেন এবং এ বাবদ কিছু টাকাও পরিশোধ করেছেন। এখন হবি ও রফিক জমি বুঝিয়ে দিতে অস্বীকার করছেন।
এ বিরোধকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ সালিশে হিলচিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবিরাজ মিয়া, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুছ, ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রিপন মিয়া, স্থানীয় মাতবর আদু মিয়া, আব্দুল মান্নান, রঙ্গু মিয়াসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
সালিশে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, সেলিম ও শাহিন হবি ও রফিককে আরও দেড় লাখ টাকা দেবেন। বিনিময়ে হবি ও রফিক তাদের দেড় শতাংশ জমি বুঝিয়ে দেবেন। তবে ওই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হননি হবি ও রফিক। এরপরই সালিশ থেকে তাদের একঘরে করার ঘোষণা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
হবি ও রফিক মিয়া অভিযোগ করেন, সালিশের সিদ্ধান্ত না মানায় তাদের সামাজিকভাবে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্রামের লোকজনকে তাদের সঙ্গে কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগ রাখা এবং আয়-রোজগারের কাজে সহযোগিতা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাদের চালকলে ধান ভাঙালে কিংবা তাদের অটোরিকশায় উঠলেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
হবি মিয়া বলেন, “আমরা পরিবার নিয়ে খুবই কষ্ট ও বিপাকে আছি। ২১ দিন ধরে কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলছে না। এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি।”
বিষয়টি জানতে বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জালাল উদ্দিনের সরকারি মুঠোফোনে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে একটি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় তাঁর কার্যালয়ে উভয় পক্ষসহ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে ডেকেছেন ইউএনও।
হিলচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাজহারুল হক নাহিদ বলেন, “সমস্যা নিয়ে এখন মানুষ চেয়ারম্যানের কাছে আসতে চায় না। কোনো পক্ষই এখনো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তবে ইউএনওর মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে বলে আশা করছি।”
বাজিতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম শহীদুল্লাহ বলেন, “কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। আমরা সকালে সরেজমিনে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করব।”
