পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজায় আমিষ বন্ধের ডাক বাগেশ্বর বাবার, প্রতিক্রিয়া রাজ্যজুড়ে
পশ্চিমবঙ্গে শারদ উৎসবের সময় পূজামণ্ডপের আশপাশে মাছ-মাংসসহ আমিষ খাবার বিক্রি নিয়ে আগেই আপত্তি তুলেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। আর এবার পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীসহ একাধিক বিজেপি নেতৃত্বের সামনেই দুর্গাপূজায় বাঙালির মাছ-মাংস খাওয়ার তীব্র সমালোচনা করলেন সনাতনী ধর্মগুরু বাগেশ্বর বাবা ওরফে মধ্যপ্রদেশের ‘বাগেশ্বর ধাম’-এর বিতর্কিত কথক ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী ওরফে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ গর্গ।
আসন্ন দুর্গাপূজার দিনগুলোতে সবাইকে সম্পূর্ণ নিরামিষ আহারের পরামর্শ দিয়ে এক কথায় আমিষ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তার দাবি, যারা আমিষ খায় তারা পাষণ্ড। আমিষ খাবারকে নোংরা খাবার বলেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) হাওড়ার লিলুয়ায় আয়োজিত বাগেশ্বর বাবার ধর্মসভায় উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বাগেশ্বর বাবাকে প্রণাম করে হাতে মা কালীর মূর্তি ও গদা তুলে দেন। তাকে ব্রিগেডে এসে ধর্মসভা করার আহ্বানও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
ধর্মসভায় বাগেশ্বর বাবা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে একটা জিনিসই খুব খারাপ লাগে- নবরাত্রির সময় মণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাওয়া হয়। যত সব খারাপ খাবার তৈরি হয়। যা আমার একেবারেই পছন্দ নয়। আমি বলব, এবার পূজায় সব হিন্দুরা জেগে উঠুন। যারা আমিষ খায় তাদের বহিষ্কার করা হোক। ওরা মোটেও ধার্মিক নয়। পাখণ্ডী (পাষণ্ড)।”
আমিষাশীদের ধর্মপ্রেম নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন বাগেশ্বর বাবা। তার বক্তব্য, “ওরা পিঁয়াজ খায়। আবার নিজেদের ধার্মিক বলে। বাংলায় থাকা হিন্দুরা জেগে উঠুন।”
এদিকে, সনাতনী ধর্মগুরুর এমন মন্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। কারও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কেউ জোর করে কিছু বলতে পারেন না বলেই দাবি করেন অনেকে।
বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যে বিজেপি ও আরএসএস-কে একহাত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র সুমন রায় চৌধুরীর বলেন, “বিজেপি, আরএসএস-এর স্লিপার সেল এরা।” তার কথায়, “দুর্গাপূজায় নবমীর দিনই পাঁঠা বলি। সরস্বতী পূজার দিন জোড়া ইলিশ। এটা শুধু আমাদের ধর্মীয় আচার নয়, এগুলো আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে মিশে গেছে। বিজেপি ও আরএসএস-এর সমস্যা হলো, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে কাজ নিজেরা করতে পারছে না, তার জন্য বিভিন্ন ধরনের স্লিপার সেল তৈরি করেছে। সনাতনী মহাসভা, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ইত্যাদি। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ফ্লেক্স লাগিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করছে। বিজেপি ভাবছে, এই কথাগুলো না বললে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ভোট হাতছাড়া হবে। তাই বিভিন্ন ধরনের স্লিপার সেল তৈরি করে ওই কথাগুলো বলাচ্ছে। হঠাত্ দেখলাম কোন এক বাবা এসে উপস্থিত হলেন, বাগেশ্বর ধাম থেকে, তিনি এসে বাঙালিদের জ্ঞান দিচ্ছেন- দুর্গাপূজায় আমিষ খাওয়া উচিত নয়, মণ্ডপের আশপাশে আমিষ নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। নবমীতে পাঁঠা বলি হবে কিনা, তা বাগেশ্বর ধামের বাবা ঠিক করে দেবেন?”
তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক তথা সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্র বলেন, “এক বাবা বলছেন বাংলায় আমিষ খাওয়া যাবে না। অষ্টমীতে আমরা ভোগ খাই। মাছ-মাংস তারপর খাওয়া হয়। মাছ-মাংস তারাপীঠ থেকে শুরু করে বহু জায়গায় দেওয়া হয়। পূজায় চিকেন রোল, সেদ্ধ ডিম খাবে না? এগুলো মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করছে। নিশ্চয়ই আমি এমন কিছু করব না যাতে আবেগে আঘাত লাগে। মন্ত্র বলতে তো আর নোংরামি করব না ? ধর্ম আর রাজনীতি কেন একসাথে আসছে। এটাতে আমাদের তীব্র আপত্তি রইল।”
মদন মিত্র আরো বলেন, “পূজা মানে উৎসব, শুধু মূর্তি পূজা নয়। এরপর তো বলবে- বিয়ে বাড়িতে মাছ-মাংস চলবে না। সংখ্যালঘুদের বিরিয়ানি চলবে না। আমি নাগরিক ও বিধায়ক হিসেবে এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। তৈলঙ্গস্বামীর থেকে বড় হয়ে গেল এই বাগেশ্বর বাবা। মানুষের ভ্রু কিন্তু কুঁচকাচ্ছে।”
বাগেশ্বর বাবার আহ্বানকে গুরুত্ব দিতে নারাজ রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। তিনি স্পষ্ট বলেন, “বহিরাগত কোনো সাধু-সন্তের পরামর্শে বাঙালির আবহমানকালের খাদ্যাভ্যাস কিংবা সংস্কৃতি বদলে যাবে না।”
শমীকের ভাষ্য, “অষ্টমীর দিন লুচি আর নবমীর দিন কচি পাঁঠার মাংস খাওয়া বাঙালির খাঁটি রীতিনীতি, আর বাঙালি সেই ঐতিহ্যই লালন করবে। কোনো সন্ত বা চিকিৎসকের নিরামিষাশী হওয়ার আহ্বান বা পরামর্শ দেওয়ার অধিকার থাকতেই পারে, কিন্তু বাংলায় বসে কে কী খাবে আর কে কী পরবে, তা বাইরে থেকে এসে কেউ ঠিক করে দেবে না।”
বাগেশ্বর বাবার প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও সৌজন্য বজায় রেখেও শমীক স্পষ্ট জানান, স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মদর্শনের ওপরে অন্য কোনো মত চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলায় মা কালীকে পাঁঠার মাংস নিবেদন করার যে সুপ্রাচীন প্রথা রয়েছে, তাকে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।
সাধারণ আমিষ আহারিদের ‘পাষণ্ড’ বলার বিষয়ে বিজেপি সভাপতি স্পষ্ট করেন যে, এই ধরনের শব্দপ্রয়োগকে তিনি কখনোই সমর্থন করেন না। অবশ্য এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য নয়, বরং এক জন সন্তের ব্যক্তিগত মতামত হওয়ায় এ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বা সংঘাতের রাস্তা এড়িয়ে গেছেন তিনি।
শমীকের কথায়, “যার ধুতি পরার ইচ্ছে সে ধুতি পরবে, যে লুঙ্গি পরে সে লুঙ্গি পরবে- বাঙালির নিজস্ব জীবনযাত্রা ও রুচিবোধের ওপর রাজনীতি বা অন্য কোনও প্রেসক্রিপশন খাটবে না।”
এর আগে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের আমলে অনুমতি না মিললেও, এবার বিজেপি রাজ্য সরকারের আমলে সাড়ম্বরে পশ্চিমবঙ্গে এসে নিজের ধর্মীয় অনুষ্ঠান করলেন বাগেশ্বর বাবা।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আতিথেয়তায় আপ্লুত হয়ে বাগেশ্বর বাবা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ এখন সুরক্ষিত হাতে রয়েছে। এখানে এবার রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে।” নাম না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে কটাক্ষ করে বলেন, “আমায় বলা হয়েছিল বাংলায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। কিন্তু এখন আমার দাদা সত্তায় এসেছেন। এখন ক্ষমতায় কোনো বাবরওয়ালি নেই, রঘুবীরওয়ালে আছেন।”
