পর্যটকের চোখে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, চরবাসীর কাছে যুদ্ধক্ষেত্র
রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মার বুকে জেগে ওঠা এক টুকরো সবুজ জনপদ। মানুষের মুখে মুখে পরিচিত পেয়েছে ‘মিডল চর’ নামে। বর্ষায় চারদিকে থইথই পানি, শুকনো মৌসুমে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ-প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের কারণে স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামেও বেশ পরিচিত। সৌন্দর্যের টানে এখানে ছুটে আসছেন দূর-দূরান্তের পর্যটকরা। কিন্তু পর্যটকের চোখে যে চর স্বর্গের মতো, সেই চরেই সাত শতাধিক মানুষের জীবন কাটছে নাগরিক সুবিধার তীব্র সংকট ও বেঁচে থাকার যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে।
মিডল চরে নেই হাসপাতাল, বাজার কিংবা কবরস্থান। নেই জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ। প্রাথমিকের পর উচ্চশিক্ষার সুযোগও সীমিত। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে গেলে মানুষ ও গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও নেই। অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসার জন্য, মৃত ব্যক্তিকে দাফনের জন্য, সন্তানকে উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াতে কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে প্রতিবারই পদ্মা নদী পার হয়ে যেতে হয় রাজশাহী শহরে। ফলে প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝেও চরবাসীর জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও বঞ্চনায় ভরা।
জানা গেছে, পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এই মিডল চরটি চরখিদিরপুরের অংশ।
‘মিডল চরে মোটামুটি ১৪০ থেকে ১৫০টি বসতি রয়েছে। ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪০০। শিশুসহ মোট জনসংখ্যা ৭০০ জনের মতো। কিন্তু এই জনপদে কোনো বাজার বা হাসপাতাল নেই। শুধু একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। চরে নিজস্ব কোনো কবরস্থানও নেই। কেউ মারা গেলে দাফনের জন্য স্বজনদের লাশ নিয়ে দূরের এলাকায় ছুটতে হয়।’
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ও চার কিলোমিটার প্রস্থের চরে রয়েছে ১৪০ থেকে ১৫০টি বসতি। মিডল চরে শিশুসহ মোট সাত শতাধিক মানুষের বসবাস করেন। চরের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি ও পশুপালন। চরে জমিতে ধান, পাট, গম, কালাইসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন বহু পরিবার।
স্থানীয়দের হিসাবে, চরজুড়ে রয়েছে প্রায় চার হাজার গরু, পাঁচ শতাধিক মহিষ এবং বিপুলসংখ্যক ছাগল ও ভেড়া। এসব গবাদিপশু শুধু পরিবারের সম্পদ নয়, অনেকের কাছে বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মিডল চর পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। পদ্মার পানি, সবুজ ফসলের মাঠ, খোলা আকাশ আর চরজুড়ে গবাদিপশুর বিচরণ মিলে তৈরি হয়েছে নৈসর্গিক পরিবেশ। তবে পর্যটকদের এই আনাগোনার আড়ালেই রয়ে গেছে চরবাসীর দীর্ঘদিনের মৌলিক সমস্যাগুলো। নদী পেরিয়ে প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোর বাধ্যবাধকতা এখানকার মানুষের জীবনকে করেছে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
‘চরে কোনো হাসপাতাল বা কবরস্থান নেই। কেউ মারা গেলে মরদেহ দাফন করতে ওপারে নিয়ে যেতে হয়। বাজার বলতে কিছু নেই। সামান্য কেনাকাটার জন্যও শহীদ বাজারে যেতে হয়। স্কুলে ওপার থেকে শিক্ষকরা আসেন। নদীর কারণে তারা অনেক সময় নিয়মিত আসতে পারেন না। বছরে ধান, পাট, গম বা কালাই-মাত্র একটি ফসল পাই। তাও অনেক সময় বন্যায় ভেসে যায়।’
চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে মিডল চরের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। এখানে নেই কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক, কমিউনিটি ক্লিনিক, ফার্মেসি কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসার স্থায়ী ব্যবস্থা। কেউ অসুস্থ হলে কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হলে তাকে নৌকায় করে পদ্মা নদী পার হয়ে মূল ভূখণ্ডে নিতে হয়। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ যেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নদীপথে নির্ভরশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আশঙ্কাজনক রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দিনে কোনোভাবে নদী পার হওয়া সম্ভব হলেও রাতের অন্ধকার, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা নদীতে ঢেউ বাড়লে ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সাপে কাটার মতো জরুরি পরিস্থিতিতেও দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় রোগীকে নৌকায় করে নদী পার করতেই মূল্যবান সময় চলে যায়। এতে চিকিৎসা পাওয়ার আগেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। তাদের দাবি, চরে অন্তত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
‘চরজুড়ে কোনো মুদি দোকান বা কাঁচাবাজার নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে ওপারে যেতে হয়। যাতায়াতেই অনেক সময় লেগে যায়। নদীর ঢেউ বাড়লে বা আবহাওয়া খারাপ থাকলে বাজারে যাওয়াও সম্ভব হয় না।’
চরের মানুষের জীবনের আরেকটি বড় সংকট হলো কবরস্থান না থাকা। নিজের বসতিতে বসবাস করলেও মৃত্যুর পর স্বজনদের মরদেহ নিয়ে যেতে হয় অন্য এলাকায়।
স্থানীয় মেম্বার ও বাসিন্দারা জানান, কারও মৃত্যু হলে নৌকায় করে পদ্মা নদী পার হয়ে খোজাপুর কিংবা দাসমারি এলাকার কবরস্থানে দাফন করতে হয়। নদীর অবস্থা খারাপ থাকলে মরদেহ নিয়ে পারাপার আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একজন মানুষের মৃত্যুর পর স্বজনদের শোকের সঙ্গে যোগ হয় মরদেহ পারাপার ও দাফনের বাড়তি দুশ্চিন্তা। চরবাসীর কাছে এটি জীবনের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও নদী পারাপার করতে হয় চরবাসীকে। মিডল চরে নেই কোনো স্থায়ী কাঁচাবাজার কিংবা মুদি দোকান। চাল, ডাল, তেল, লবণ, ওষুধসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাদের নৌকায় করে পদ্মা নদী পার হয়ে সাহেব বাজার, শহীদ বাজার কিংবা কাটাখালী এলাকায় যেতে হয়। নদী উত্তাল থাকলে কিংবা আবহাওয়া খারাপ হলে অনেক সময় বাজারে যাওয়াও সম্ভব হয় না। এতে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে যেমন বাড়তি সময় লাগে, তেমনি নৌযাতায়াতের জন্য বাড়তি খরচও গুনতে হয়।

চরের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, চরজুড়ে কোনো মুদি দোকান বা কাঁচাবাজার নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে ওপারে যেতে হয়। যাতায়াতেই অনেক সময় লেগে যায়। নদীর ঢেউ বাড়লে বা আবহাওয়া খারাপ থাকলে বাজারে যাওয়াও সম্ভব হয় না।
কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও নদী পারাপালের এই সমস্যা প্রভাব ফেলে। চরে উৎপাদিত ধান, পাট, গম, কালাইসহ বিভিন্ন ফসল মূল ভূখণ্ডের বাজারে নিতে হয়। একইভাবে গবাদিপশু বিক্রি কিংবা পশুর চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও নদী পার হয়ে যেতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। অনেক সময় দ্রুত বাজারে নিতে না পারায় কৃষক ও পশুপালকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
পদ্মার চর হওয়ায় বন্যা এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। বর্ষা ও ভাদ্র-আশ্বিনে নদীর পানি বাড়লে চরের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়। কোথাও ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে, কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কিন্তু বন্যার সময় মানুষ ও গবাদিপশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ফলে বাসিন্দাদের পরিবার-পরিজন, প্রয়োজনীয় মালামাল ও গবাদিপশু নিয়ে দূরের উঁচু জায়গা কিংবা মূল ভূখণ্ডে আশ্রয় নিতে হয়।
চরের বাসিন্দা শাহজাহান বলেন, প্রতিবছর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে বন্যা হলে ঘরবাড়ি ডুবে যায়। তখন চরের মানুষ সহায়-সম্বল নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বন্যার সময় বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় আমাদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। চরের প্রায় প্রতিটি ঘরে প্রচুর গরু-ছাগল থাকলেও বন্যার সময় সেগুলো রাখার মতো কোনো উঁচু জায়গা বা আশ্রয়কেন্দ্র নেই।
তিনি আরও বলেন, বন্যার পানিতে ধান, পাট, গম, কালাইসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হওয়ায় চরবাসীর অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগে। গবাদিপশুই আমাদের বড় সম্পদ। কিন্তু বন্যার সময় সেগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয়। নৌকায় করে পশু পারাপারের সময় দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যাওয়া কিংবা পশু মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
বন্যার সময় শুধু ঘরবাড়ি ও ফসল নয়, চরবাসীর স্বাভাবিক চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। পানি বাড়লে এক বসতি থেকে অন্য বসতিতে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিষধর সাপের উপদ্রব বাড়ায় শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় অনেক পরিবারকে আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। গবাদিপশুর জন্য আলাদা উঁচু জায়গা না থাকায় বিপাকে পড়তে হয় পশুপালকদের।
শিক্ষাক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে মিডল চর। চরের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়নির্ভর। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টিতে প্রায় ২৪০ শিক্ষার্থী রয়েছে এবং শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। তবে শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মূল ভূখণ্ড থেকে নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসেন। নদীর পানি, আবহাওয়া ও নৌযান সমস্যার কারণে অনেক সময় তাদের নিয়মিত যাতায়াত ব্যাহত হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এর প্রভাব পড়ে পাঠদানেও।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে নদী পার হয়ে মূল ভূখণ্ড কিংবা শহর এলাকায় যেতে হয়। প্রতিদিন নদী পারাপারের ঝুঁকি, নৌযাতায়াতের খরচ এবং পড়াশোনার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কঠিন। ফলে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন প্রাথমিক পর্যায়েই থেমে যায় বলে জানান স্থানীয়রা। চরেই একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথ পারাপার কমার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত মিডল চরের মানুষ। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ এখনো এখানে পৌঁছায়নি। ফলে বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা সৌরবিদ্যুৎ। সরকারি উদ্যোগে কিছু পরিবারকে সোলার প্যানেল দেওয়া হলেও তা সবার কাছে পৌঁছেনি। অনেকের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। আবার মেঘলা কিংবা বৃষ্টির দিনে সোলার প্যানেল থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।
সোলারের বিদ্যুৎ দিয়ে মূলত রাতে আলো জ্বালানো ও মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার মতো সীমিত কাজ করা যায়। ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক পাখা, পানির পাম্প কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই বললেই চলে। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অন্ধকারের পাশাপাশি বিষধর সাপ ও অন্যান্য প্রাণীর ভয়েও থাকতে হয় চরবাসীকে। বিদ্যুতের এই সীমাবদ্ধতা শিশুদের পড়াশোনা এবং পরিবারের দৈনন্দিন কাজেও প্রভাব ফেলে।
চরের জমির মালিকানা ও সরকারি রেকর্ড নিয়েও রয়েছে নানা অনিশ্চয়তা। একাধিক বাসিন্দা জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে জমি ভোগদখলে থাকলেও অনেক জমির খাজনা ও নামজারির কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। জমির সরকারি রেকর্ড ও মালিকানা নিয়ে জটিলতা থাকায় নিজেদের ভিটেমাটি নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা। ভবিষ্যতে প্রভাবশালী কেউ জমি দখল কিংবা উচ্ছেদের চেষ্টা করতে পারে-এমন আশঙ্কাও রয়েছে অনেকের মধ্যে। তাই জমির সঠিক রেকর্ড, খাজনা ও নামজারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দীর্ঘ সাত বছর ধরে পরিবারের ১১ সদস্য নিয়ে মিডল চরে বসবাস করছেন সীমা বেগম। চরের জীবনযাত্রার দুর্ভোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, বন্যার সময় ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেলে অন্যের বাড়িতে থাকতে হয়। নিজের বাড়িতে থাকা যায় না। সাপের ভয়, পোকামাকড় আর নদীর ঢেউয়ের মধ্যে চরম ভয়ে দিন কাটে।
সীমা বেগম আরও বলেন, চরে কোনো হাসপাতাল বা কবরস্থান নেই। কেউ মারা গেলে মরদেহ দাফন করতে ওপারে নিয়ে যেতে হয়। বাজার বলতে কিছু নেই। সামান্য কেনাকাটার জন্যও শহীদ বাজারে যেতে হয়। স্কুলে ওপার থেকে শিক্ষকরা আসেন। নদীর কারণে তারা অনেক সময় নিয়মিত আসতে পারেন না। বছরে ধান, পাট, গম বা কালাই-মাত্র একটি ফসল পাই। তাও অনেক সময় বন্যায় ভেসে যায়।
চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, মিডল চর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে শোভিত দারুণ একটি জায়গা। এখানে আকাশের সঙ্গে যেন সবুজ জমিন মিশে গেছে। বন্ধুদের সঙ্গে এখানে এসেছিলাম। দারুণ উপভোগ করেছি।
তবে নদীপথের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উত্তাল পদ্মায় সতর্কতার সঙ্গে যাতায়াত করা জরুরি। একই সঙ্গে এত সুন্দর একটি জায়গার বাসিন্দারা যদি মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাহলে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
এদিকে চরবাসীর দাবি, তাদের জীবনমান উন্নয়নে দ্রুত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল স্থাপন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি উচ্চ বিদ্যালয়, পর্যাপ্ত সোলার প্যানেল, নিজস্ব কবরস্থান, নিরাপদ নৌযাতায়াত এবং বন্যার সময় মানুষ ও গবাদিপশুর জন্য উঁচু ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে জমির খাজনা-নামজারি ও রেকর্ডসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে সহজ যোগাযোগব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, মিডল চরে মোটামুটি ১৪০ থেকে ১৫০টি বসতি রয়েছে। ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪০০। শিশুসহ মোট জনসংখ্যা ৭০০ জনের মতো। কিন্তু এই জনপদে কোনো বাজার বা হাসপাতাল নেই। শুধু একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। চরে নিজস্ব কোনো কবরস্থানও নেই। কেউ মারা গেলে দাফনের জন্য স্বজনদের লাশ নিয়ে দূরের এলাকায় ছুটতে হয়।
তিনি বলেন, সব মিলিয়ে চরের মানুষের জীবনযাপন একটু কষ্টসাধ্য। মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা গেলে মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, মিডলচরে পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পর্যটনকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চরে শিক্ষা, চিকিৎসা, কবরস্থানসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি, বন্যার সময় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কবরস্থান ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিবেশের ভারসাম্য বিবেচনায় রাখতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে একদিকে যেমন চরবাসীর জীবনমান উন্নত হবে, অন্যদিকে মিডলচরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এনএইচআর/জেআইএম
