ঋণের জন্য চাপ-মারধরের মামলায় সালমান এফ রহমানকে গ্রেফতার দেখালেন আদালত
তিস্তা সোলার প্রকল্প ও বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়মবহির্ভূত ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা দিতে রাজি না হওয়ায় বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে মারধর, হুমকি ও জোর করে পদত্যাগ করানোর অভিযোগের মামলায় সালমান এফ রহমানকে গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (১৭ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত এ আদেশ দেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্বাস উদ্দীন জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদ রানা ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত মো. মনিরুল ইসলাম খান ও খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জামিনে রয়েছেন। বর্তমানে কারাগারে থাকা সালমান এফ রহমানকে সোমবার এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দেওয়া হয়। মামলার প্রধান আসামি আব্দুর রউফ তালুকদারসহ আরও তিনজন পলাতক রয়েছেন বলে জানান আইনজীবী।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিআইএফএফএলের সাবেক সিইও এস এম ফরমানুল ইসলাম ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন। আদালতের নির্দেশে অভিযোগটি তদন্ত করে পিবিআই।
মামলায় সালমান এফ রহমান ছাড়াও সাবেক অর্থসচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
যেসব ঋণ দিতে চাপের অভিযোগ
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, বিআইএফএফএলের সিইও থাকাকালে এস এম ফরমানুল ইসলামের ওপর সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা অনুমোদনের চাপ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে তিস্তা সোলার প্রকল্পে প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্য থাকায় তৎকালীন সিইও ওই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি বলে অভিযোগ।
এ ছাড়া সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ২০০ কোটি টাকার জিরো কুপন বন্ডে আগাম বিনিয়োগ এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য জামানত ছাড়াই শতকোটি টাকার ঋণ দেওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। তবে ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এসব প্রস্তাবেও সাড়া দেননি ফরমানুল ইসলাম।
‘মারধর করে পদত্যাগে বাধ্য’ করার অভিযোগ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই বিআইএফএফএলের ৮০তম পর্ষদ সভায় কাঙ্ক্ষিত ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ফরমানুল ইসলামের ওপর চড়াও হন আসামিরা।
একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধর করা হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ।
এ ছাড়া তার দাপ্তরিক মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবহারে বাধা দেওয়া এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির চাবি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়েছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত শেষে জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মারধর, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে পিবিআই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। আদালত তা আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। পরে তারা আদালতে হাজির না হওয়ায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
পরবর্তীতে মামলার ৩ নম্বর আসামি মনিরুল ইসলাম খান এবং ৫ নম্বর আসামি খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাদের জামিন মঞ্জুর করা হয়। আর কারাবন্দী সালমান এফ রহমানকে সোমবার এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হলো।
এমডিএএ/এমএমকে
