জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচন: ‘নারী মহাসচিব’ ও বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ


মাসউদুর রহমান: বিশ্বরাজনীতির শীর্ষতম মঞ্চ জাতিসংঘের পরবর্তী অভিভাবক নির্বাচনের প্রাক্কালে বিশ্বজুড়ে নতুন এক গতিশীলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদের সমাপ্তি ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে নিউ ইয়র্কের ইস্ট নদীর তীরে এখন মূল আলোচনার বিষয়—জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে কি এবারই প্রথম কোনো নারী মহাসচিব পেতে যাচ্ছে বিশ্ব? নাকি ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে ধরাশায়ী হবে নারী নেতৃত্বের এই বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষা?

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯ জন প্রতিনিধি মহাসচিবের পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, যাদের সকলেই পুরুষ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ যৌথভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে যোগ্য নারী প্রার্থীদের সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছে। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইতোমধ্যে একঝাঁক অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী নারী প্রার্থী নির্বাচনী দৌড়ে সামিল হয়েছেন। ইকুয়েডরের কূটনীতিক ইভোনে আবাকি, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (UNCTAD)-এর প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেট, এবং ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা-র মতো জ্যেষ্ঠ নারী কূটনীতিকদের নাম এবার বেশ জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।

ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের শীর্ষ পদে ভৌগোলিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি অলিখিত নিয়ম রয়েছে। এবারের আবর্তনে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল (GRULAC) থেকে মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে প্রবল। এ অঞ্চলে একাধিক অভিজ্ঞ নারী কূটনীতবিদের উপস্থিতি নারী প্রার্থী নির্বাচনের পথকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। তবে একই সাথে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রধান রাফায়েল গ্রসি এবং আফ্রিকার প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিবিদরাও এই দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নিরপত্তা পরিষদের ‘ভিটো’ এবং পরাশক্তির দরকষাকষি জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, মহাসচিব নির্বাচনের প্রাথমিক ও মূল চালিকাশক্তি হলো ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ। পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের (P5) একছত্র ভিটো ক্ষমতা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। বর্তমান বিশ্বে চলমান ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে এই পাঁচ দেশের ঐকমত্যে পৌঁছানো এক জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষী, অতীতে অনেক যোগ্য প্রার্থীই নিরাপত্তা পরিষদের দরকষাকষির শিকার হয়েছেন। ফলে, প্রার্থীদের পেশাদারি দক্ষতা ও সংস্কারমুখী দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিকভাবে তারা কতটা ‘গ্রহণযোগ্য’ বা ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, সেটিই চূড়ান্ত জয়ের মাপকাঠি হয়ে ওঠে।

বিশ্বব্যাপী যখন জেন্ডার সমতা, মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রতিষ্ঠার সোচ্চার উচ্চারণ চলছে, তখন শীর্ষ বৈশ্বিক সংস্থায় নারী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করে। জাতিসংঘের নীতি-নির্ধারণী কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে দৃঢ় পদক্ষেপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংকট মোকাবিলায় একজন সাহসী ও প্রজ্ঞাবান নেত্রীকে দেখার প্রত্যাশা বিশ্বজুড়ে বেড়েই চলেছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি (Straw Polls) ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে যে, পরাশক্তিগুলো বৈশ্বিক সংস্কারের পক্ষে সাড়া দিয়ে ইতিহাস গড়বে, নাকি তাদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে। জাতিসংঘের নবম মহাসচিবের মেয়াদের শেষ লগ্নে এসে বিশ্ব সম্প্রদায় এখন প্রতীক্ষায় —জাতিসংঘ কি তার ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করবে, নাকি পুরনো রাজনীতির বৃত্তেই আটকে থাকবে ?



রোহান/সা.এ.





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *