সাতক্ষীরায় ঘেরের আইলে ৮৭৫ হেক্টরে চাষ, মাছে-সবজিতে লাভবান কৃষক 


সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক ধরে তালা উপজেলার দিকে এগোলেই চোখ জুড়িয়ে যায় দিগন্তবিস্তৃত জলাশয় আর চারপাশের গাঢ় সবুজের সমারোহে। সাতক্ষীরার মাছের ঘেরগুলোর চিত্র এখন অনেকটা বদলে গেছে। ঘেরের আইল বা পাড়গুলোকে আর কেবল সীমানা নির্ধারক হিসেবে ফেলে রাখছে না স্থানীয় চাষিরা; বরং সেই পতিত জমিতে গড়ে তুলেছে ফলনশীল সবজির খেত।

কৃষকরা বলছেন, জেলার মোট সবজি চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ এখন ঘেরের আইল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে পণ্য পাঠানো সহজ হয়েছে, যা সবজি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়েছে। পাশাপাশি বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের তৎপরতা রোধে তদারকি জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাত উপজেলায় ৮৭৫ হেক্টর জমিতে এই সমন্বিত আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ৩৪০ হেক্টর জমিতে ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ হয়েছে। তালা উপজেলায় ১৬৫ হেক্টরে, কালীগঞ্জ উপজেলায় ১৩৫ হেক্টরে, আশাশুনি উপজেলায় ৮০ হেক্টরে, শ্যামনগর উপজেলায় ৮০ হেক্টরে, কলারোয়া উপজেলায় ৫৫ হেক্টরে এবং দেবহাটা উপজেলায় ২০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকেরা বর্ষাকালীন সবজি তোলার সঙ্গে সঙ্গে আগাম শীতকালীন ফসলের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছে।  

তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের ৩০ একর ঘেরের মালিক বড়বিলা গ্রামের রশিদ আমিন জানান, তিনি আগে শুধু মাছ চাষে সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে এবার ৮০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করে ঘেরের তিন পাশের পাড়ে সবজি আবাদ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই সবজি থেকে তাঁর দেড় থেকে দুই লাখ টাকা বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

তালা উপজেলার মিঠাবাড়ি গ্রামের কৃষক মোতাহার হোসেন বলেন, নিচে পানিতে খেলা করছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, আর ওপরে বাঁশের মাচায় ঝুলছে লাউ, চালকুমড়া, করলা ও বরবটি। আইলের সমতল অংশে সারিবদ্ধভাবে দেখা মিলছে ঢেঁড়স, পুঁইশাক ও কলাগাছের। স্থানীয়দের ভাষায় ‘সাথি ফসল’ নামের এই সমন্বিত চাষাবাদ পদ্ধতি এখন গোটা জেলাজুড়ে এক সম্ভাবনাময় কৃষিকাজে রূপ নিয়েছে। ঘেরের পতিত জমি কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত আয় করতে পেরে জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় চাষিরা। তবে ফলনে সফলতা এলেও বাজারজাতকরণ নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে কৃষকদের। 

তালা শাকদাহ এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা ক্ষেত থেকে যে সবজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে পাইকারদের কাছে দিতে বাধ্য হন, সাধারণ বাজারে সেটিই বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। সরাসরি বড় বাজারে পৌঁছানোর মাধ্যম না থাকায় বাধ্য হয়ে স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম মূল্যে ফসল তুলে দিতে হচ্ছে।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, জেলাজুড়ে উৎপাদিত লাউ, শিম, শসা ও বরবটি ইতোমধ্যে বাজারে আসছে এবং কৃষকেরাও এটি থেকে বাড়তি আয় করছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার প্রায় ৮৭৫ হেক্টর ঘেরের পাড়ে নানাজাতের সবজির আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের ধারণা, হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ১৯ টন ধরে এ বছর ঘেরের পাড় থেকে পাওয়া যাবে প্রায় ১৬ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন সবজি।

মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত সাতক্ষীরায় একই জমিতে দ্বিমুখী এই উৎপাদন ব্যবস্থা এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার রূপ নিয়েছে। তবে কৃষকের কঠোর পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। 





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *