উদযাপন নয়, ইতিহাস থেকে শেখাই মুক্তি


যদি অতীত হয় বর্জ্য কাগজ, বর্তমান হয় সংবাদপত্র, আর ভবিষ্যৎ হয় টিস্যু পেপার, তবে জীবন কী? প্রশ্নটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের অস্তিত্ব, সভ্যতা এবং সময়ের এক গভীর দর্শন। অতীতকে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, যেন সেটি বর্জ্য কাগজ।

বর্তমানকে আঁকড়ে ধরি সংবাদপত্রের মতো, যা সকালে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই তার মূল্য কমে যায়। আর ভবিষ্যৎকে আমরা এমনভাবে ব্যবহার করি, যেন সেটি টিস্যু পেপার, প্রয়োজন শেষ হলে যার আর কোনো গুরুত্ব থাকে না।

কিন্তু জীবন কি সত্যিই এতটাই সামান্য? এই পৃথিবীকে দেখুন। কত নিখুঁত একটি সৃষ্টি। নদী তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলে, বৃক্ষ নীরবে অক্সিজেন বিলিয়ে যায়, পাখিরা প্রতিদিন নতুন ভোরের গান গায়, ঋতুগুলো একে অন্যের হাত ধরে পৃথিবীকে রঙিন করে তোলে। প্রকৃতি কখনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, যতক্ষণ না মানুষ তার স্বাভাবিক ভারসাম্যে হস্তক্ষেপ করে।

অথচ মানুষ, যে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী বলে দাবি করে, সেই মানুষই প্রতিনিয়ত এই সৌন্দর্যকে অসুন্দর করে তুলছে। উন্নয়নের নামে বন কাটা হচ্ছে, ভোগের নামে নদী দূষিত হচ্ছে, ক্ষমতার নামে যুদ্ধ তৈরি হচ্ছে, আর অগ্রগতির নামে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মানবিকতাকেই বিসর্জন দিচ্ছে।

আমরা প্রায়ই বলি, পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কার পৃথিবী এগিয়েছে? কিছু মানুষের জীবন নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। প্রযুক্তি, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবন কি একইভাবে বদলেছে? কোটি কোটি মানুষ এখনও ক্ষুধা, যুদ্ধ, বৈষম্য, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে আছে। তাহলে উন্নয়নের এই গল্প কি সবার গল্প, নাকি মাত্র কয়েকজনের?

আমরা সংবাদপত্রে যাদের দেখি, তাদের অধিকাংশই ক্ষমতার কেন্দ্রের মানুষ। তাদের সিদ্ধান্ত, তাদের সাফল্য, তাদের সংঘাতই শিরোনাম হয়। কিন্তু সেই কৃষকের গল্প কোথায়, যিনি খরার সঙ্গে যুদ্ধ করে খাদ্য উৎপাদন করেন? সেই শ্রমিকের গল্প কোথায়, যার ঘামে শহর দাঁড়িয়ে থাকে? সেই শিশুর গল্প কোথায়, যে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখার আগেই বাস্তবতার কাছে হার মানে?

আরও একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরই করা উচিত। আমরা কি শুধু মানুষের পৃথিবীর কথা ভাবছি, নাকি পৃথিবীরও কথা ভাবছি?
এই গ্রহ শুধু মানুষের নয়। অসংখ্য প্রাণী, উদ্ভিদ, বন, নদী, পাহাড় এবং সমুদ্রেরও সমান অধিকার রয়েছে এই পৃথিবীতে। অথচ তাদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। তারা আদালতে যায় না, সংবাদ সম্মেলন করে না, নির্বাচনে ভোট দেয় না। তাই তাদের নীরবতাকে আমরা দুর্বলতা ভেবে বসেছি।

কিন্তু প্রকৃতির নীরবতারও একটি সীমা আছে। যখন সেই সীমা অতিক্রম হয়, তখন খরা, বন্যা, দাবানল, ঝড় কিংবা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মাধ্যমে প্রকৃতি তার ভাষায় উত্তর দেয়।

সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংকট প্রযুক্তির ঘাটতি নয়, বিবেকের অসম বণ্টন। আমরা জ্ঞান অর্জন করেছি, কিন্তু প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারিনি। আমরা সম্পদ সৃষ্টি করেছি, কিন্তু ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে পারিনি। আমরা পৃথিবীকে বদলানোর ক্ষমতা অর্জন করেছি, কিন্তু নিজেদের বদলানোর সাহস এখনও পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।

তাহলে জীবন কী? জীবন শুধু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের হিসাব নয়। জীবন হলো দায়িত্ব। জীবন হলো শেখা, বোঝা এবং রেখে যাওয়া। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া, বর্তমানকে অর্থবহ করে তোলা এবং ভবিষ্যৎকে যত্নের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার নামই জীবন।

যদি অতীত সত্যিই বর্জ্য কাগজ হয়ে যায়, তবে আমাদের ভুলগুলোও হারিয়ে যাবে। যদি বর্তমান কেবল সংবাদপত্রের মতো একদিনের গল্প হয়ে থাকে, তবে মানবতার কোনো স্থায়ী মূল্য থাকবে না। আর যদি ভবিষ্যৎকে আমরা টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করি, তবে একদিন আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো একটি সুস্থ পৃথিবীও আর থাকবে না।

জীবনের প্রকৃত অর্থ হয়তো এখানেই। পৃথিবীকে শুধু ব্যবহার করার জন্য নয়, তাকে আরও সুন্দর করে রেখে যাওয়ার জন্যই মানুষের জন্ম। কারণ একটি সুন্দর পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া সৌভাগ্য, কিন্তু সেই পৃথিবীকে সুন্দর রেখে যাওয়া দায়িত্ব।

কিছু দিন আগে ছিল ৫ আগস্ট। সারা বাংলাদেশ নানা আয়োজন, আলোচনা, স্মৃতিচারণ এবং শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলিকে স্মরণ করেছে। যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা নিজেদের বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিনই স্মরণীয় হওয়া উচিত, কারণ কোনো জাতি তার স্মৃতিকে অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারে না।

কিন্তু একটি প্রশ্ন কি আমরা নিজেদের করেছি? আমরা কী পেলাম? আমরা কী শিখলাম? আমরা কী অর্জন করলাম? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা কোথায় যাচ্ছি?

একটি দিন উদযাপন করা সহজ। একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাও সহজ। কিন্তু একটি জাতির চরিত্র নির্মাণ করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। ইতিহাস শুধু অতীতকে স্মরণ করার জন্য নয়, ভবিষ্যৎকে সংশোধন করার জন্যও। যদি ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া যায়, তবে ইতিহাস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে থাকে।

৫ আগস্টের পরের দিন ছিল ৬ আগস্ট। ৫ আগস্টের স্লোগান থেমে গেছে, মঞ্চ গুটিয়ে গেছে, সংবাদপত্রে নতুন শিরোনাম এসেছে। কিন্তু মানুষের জীবনে কী বদল এসেছে? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ, এসব কি এক ধাপও এগিয়েছে? নাকি আমরা আবারও এমন এক ভবিষ্যতের অপেক্ষায় আছি, যেখানে পুরোনো প্রশ্নগুলোর ওপর নতুন রঙ লাগানো হবে?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিন বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নগুলো কি বদলেছে? ৫ আগস্টের স্মৃতি আজও আমাদের সামনে সেই একই প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি সত্যিই নিজেদের পরিবর্তন করতে পেরেছি, নাকি শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদযাপনের ভাষা পরিবর্তন করেছি?

আগামী দিন কোনো রহস্য নয়। আগামীকাল তৈরি হয় আজকের সিদ্ধান্ত, আজকের সততা এবং আজকের দায়িত্ব থেকে। যে জাতি প্রতিটি ঘটনার পর আত্মসমালোচনা করতে শেখে, সে জাতি এগিয়ে যায়। আর যে জাতি শুধু উদযাপন করে, কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করে না, সে একই বৃত্তে বারবার ঘুরে ফিরে আসে।

সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি আন্দোলন নয়; প্রয়োজন একটি জাগ্রত বিবেক। এমন একটি বিবেক, যা দল, ব্যক্তি, ক্ষমতা কিংবা মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখে। কারণ কোনো জাতির প্রকৃত মুক্তি কেবল শাসকের পরিবর্তনে আসে না; আসে মানুষের চিন্তার পরিবর্তনে, মূল্যবোধের পরিবর্তনে এবং দায়িত্ববোধের বিকাশে।

তাই প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে, যদি অতীত হয় বর্জ্য কাগজ, বর্তমান হয় সংবাদপত্র, আর ভবিষ্যৎ হয় টিস্যু পেপার, তবে জীবন কী? আজ আমার উত্তর আরও স্পষ্ট।

জীবন কোনো কাগজ নয়। জীবন একটি অঙ্গীকার। এমন এক অঙ্গীকার, যেখানে ইতিহাসকে শুধু স্মরণ করা হয় না, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়; বর্তমানকে শুধু আলোচনা করা হয় না, তাকে সৎ কর্মে রূপ দেওয়া হয়; আর ভবিষ্যৎকে শুধু কল্পনা করা হয় না, তাকে যত্ন, ন্যায়, মানবতা এবং দায়িত্ব দিয়ে নির্মাণ করা হয়।

যেদিন আমরা একটি জাতি হিসেবে এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারব, সেদিন ৫ আগস্ট, কিংবা অন্য যে কোনো ঐতিহাসিক দিন, শুধু উদযাপনের দিন হবে না; সেদিনগুলো হয়ে উঠবে আমাদের বিবেক জাগরণের দিন। আর তখনই আমরা বলতে পারব, আমরা শুধু ইতিহাস রচনা করিনি, ইতিহাস থেকে শিখতেও পেরেছি।

রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

এমআরএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *