মরদেহ উদ্ধারের গুজবে নিখোঁজ ৫ জেলের জন্য খোঁড়া হলো কবর
বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবির পর বরগুনার পাথরঘাটার পাঁচ জেলের নিখোঁজের ঘটনায় মরদেহ উদ্ধারের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। খবর শুনে স্বজনরা তাদের বাড়িতে কবর খনন, কাফনের কাপড় কেনাসহ দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। তবে নিখোঁজ জেলেদের মৃত্যুর বা মরদেহ উদ্ধারের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এখনো তাদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
নিখোঁজ জেলেরা হলেন—মো. বিল্লাল, মো. কাওসার, মো. নুর আলম, মো. শাকিল ও মো. ইব্রাহিম। তারা সবাই বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার সকালে পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে ১৩ জন জেলে এফবি বরকত নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যান। সোমবার বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে সাগরে নোঙর করা অবস্থায় উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়। এ সময় ট্রলারে থাকা ১৩ জেলের মধ্যে আটজন সাঁতরে কাছাকাছি থাকা অন্য একটি ট্রলারে উঠতে সক্ষম হন। তবে নিখোঁজ হন পাঁচজন।

পরে ট্রলার মালিক সমিতির পক্ষ থেকে নিখোঁজ জেলেদের সন্ধানে দুটি ট্রলার সাগরে পাঠানো হয়। এর মধ্যেই তাদের মরদেহ উদ্ধারের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। খবর শুনে স্বজনদের মধ্যে আহাজারি শুরু হয়। অনেক বাড়িতে শুরু হয় দাফনের প্রস্তুতি। কবর খননের পাশাপাশি কাফনের কাপড়ও কেনা হয়।
সরেজমিনে পাথরঘাটা উপজেলার গহরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিখোঁজ নুর আলমের মৃত্যুর খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী, বাবা ও মা। স্বজনরা কবর খনন করছেন। কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ পানি গরম করছেন। বাড়িতে স্বজনদের ভিড় বাড়তে থাকে। তবে সকাল গড়িয়ে বিকেল হলেও মরদেহ না আসায় বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পারেন, এখনো নিখোঁজ পাঁচ জেলের সন্ধান মেলেনি।
নুর আলমের চাচা ফারুক মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সকালে খবর পেলাম নুর আলমসহ অন্য জেলেদের মরদেহ পাওয়া গেছে। বাড়িতে নিয়ে আসা হচ্ছে। এ কথা শুনে কাফনের কাপড়, কবর খননসহ দাফনের সব প্রস্তুতি নিই। আমরা খাট নিয়ে নদীর পারে বিকেল পর্যন্ত বসে ছিলাম। পরে শুনি, এ খবর সত্য নয়।’
‘আমার ছেলে জীবিত না মৃত—এখন সবই অনিশ্চিত’—আহাজারি করে নুর আলমের বাবা জাহাঙ্গীর মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রলারডুবির পর আজ সকালে শুনলাম আমার ছেলের মরদেহ পাওয়া গেছে। সারাদিন আমরা দাফনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম। এখন শুনি এটা গুজব। সরকারের কাছে দাবি, আমার ছেলের লাশটা অন্তত এনে দিক। ট্রলার মালিকপক্ষ থেকে তাদের খুঁজতে সাগরে ট্রলার গেছে। কিন্তু তাদেরও কোনো খোঁজ নেই।’
ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা জেলে জামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু নিখোঁজ জেলেরা কোথায় আছে তা জানি না। তারা ট্রলারের ভেতরে আটকে আছেন নাকি ভেসে গেছেন, তাও জানি না। মানুষের কাছে শুনেছি তাদের মরদেহ পাওয়া গেছে।’
নিখোঁজ জেলে কাওসারের স্ত্রী তামান্না জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত স্বামীর বিষয়ে কোনো সঠিক খবর পাইনি। অনেকের কাছে মরদেহ উদ্ধারের কথা শুনেছি। সে কারণেই কবর খনন করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না।’

এ বিষয়ে পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডুবে যাওয়া ট্রলারের নিখোঁজ পাঁচ জেলেই এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের মরদেহ ভাসমান অবস্থায় দেখা গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে পাথরঘাটা থানা এলাকায় এখনো কোনো মরদেহ পৌঁছায়নি। তাই মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।’
এদিকে নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আলহাজ নুরুল ইসলাম মণি। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারের বিষয়ে আমি তদারকি করছি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি, যাতে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার হয়। দল-মত নির্বিশেষে জেলেরা আমার খুব আপন মানুষ এবং তারা খুব অসহায়। এসব জেলেদের পাশে আমি সব সময় আছি। সে যে দলেরই হোক, আমাকে ভোট দিক বা না দিক—প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা আমার তরফ থেকে ইনশাআল্লাহ করা হবে।’
নুরুল আহাদ অনিক/কেএইচকে
