পরিত্যক্ত খনি থেকে রূপকথার গ্রাম: চীনের ওয়াংশ্যান ভ্যালির গল্প


চীনের জিয়াংসি প্রদেশের শাংরাও (Shangrao) শহরের প্রাকৃতিক কোলজুড়ে বিস্তৃত ওয়াংশ্যান উপত্যকা (Wangxian Valley)। অতীতে এটি একটি পরিত্যক্ত পাথরের খনি ছিল। তবে সেই রুক্ষ পরিত্যক্ত খনি থেকে এটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে এক অতিপ্রাকৃত ও অপরূপ স্বর্গে। প্রতি বছর দশ লাখেরও বেশি পর্যটক এই উপত্যকায় ভিড় জমান।

পাহাড়ের খাড়া গিরিখাত, রহস্যময় ঝরনার ধারা, স্থানীয় সমৃদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন ও সন্ধ্যার পরপরই চোখ ধাঁধানো সোনালি রঙয়ের সজ্জা পর্যটকদের বিমোহিত করে। প্রকৃতি, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, রোমাঞ্চকর অভিযান ও লোক ঐতিহ্যের অপূর্ব সংমিশ্রণে ওয়াংশ্যান উপত্যকা এখন বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের জন্য এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

পাহাড়, নদী, উপত্যকা, প্রাচীন গ্রাম, মন্দির, বন ও ফসলি জমির প্রাকৃতিক সম্পদকে ভিত্তি করে ও বিলুপ্তপ্রায় স্থানীয় সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে এই পর্যটন কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে।

‘ওয়াংশ্যান’ শব্দটির অর্থ হলো ‘অমরদের পানে চেয়ে থাকা’। এই নামকরণের ইতিহাস পূর্ব হান রাজবংশের (২৫-২২০ খ্রিষ্টাব্দ) সময়কালের ও তিন রাজ্যের যুগে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্থানীয় রূপকথা অনুযায়ী, প্রাচীনকালে মহামতি ‘হু জুইউ’ এখান থেকেই স্বর্গের অমর প্রাসাদে আরোহণ করেছিলেন। ফলে প্রাচীনকাল থেকেই এই স্থানটিকে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক গুরুত্বের ভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে পাহাড় ভেঙে ও খাদ তৈরি হয়ে প্রকৃতির আপন হাতের ছোঁয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এই চোখজুড়ানো উপত্যকা। বর্তমানে এখানকার বনভূমির পরিমাণ শতকরা ৮১ ভাগ। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এই উপত্যকার উঁচু পর্বতমালা ও গভীর গিরিখাত প্রকৃতির এক আদিম সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে। উপত্যকা জুড়ে বয়ে চলা স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির ঝরনা ও নদীর কুলকুল ধ্বনি পাখিদের কলকাকলির সাথে মিশে এক শান্তিময় আবহ তৈরি করে।

 

এখানকার ঝরনাগুলোর মধ্যে ‘ওয়াংশ্যান ঝরনা’ (Wangxian Waterfall) সবচেয়ে বিখ্যাত, যা বিশাল উচ্চতা থেকে গড়িয়ে পড়ে কুয়াশাময় পরিবেশ তৈরি করে। এর পাশাপাশি তাওবাদী প্রশান্তি বহনকারী ‘সানচিং ঝরনা’ (Sanqing Waterfall), বৌদ্ধ দেবী গুয়ানযিনের করুণার প্রতীকস্বরূপ গঠিত ‘কুয়ানইন ঝরনা’ (Guanyin Waterfall) ও সূর্যের আলোয় বর্ণিল হয়ে ওঠা ‘রেইনবো ঝরনা’ (Rainbow Waterfall) পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া পুরো উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিচিত্র আকৃতির দানবীয় পাথরগুলো প্রকৃতির এক পাথুরে শিল্পকর্মের রূপ নিয়েছে।

ওয়াংশ্যান উপত্যকা কেবল প্রাকৃতিকভাবেই সমৃদ্ধ নয়, বরং স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক বিচারেও এক অনন্য বিস্ময়। খাড়া পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত প্রাচীন ধাঁচের রিসোর্টগুলো এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। উদাহরণস্বরূপ, ‘হোয়াইট ক্রেন ক্লিফ’ বা ‘বাইহে ইয়া’-এর কথা বলা যায়। উপত্যকার মেঝের ১১০ মিটার ওপরে পাহাড়ের গায়ে কাঁচের দেয়াল দিয়ে নির্মিত ১২টি অতিথি কক্ষ, একটি লাইব্রেরি ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। রাতে এখান থেকে তারাভরা খোলা আকাশ দেখার অনুভূতি সত্যি অতুলনীয়।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই উপত্যকা একটি জীবন্ত জাদুঘর। এর আঁকাবাঁকা পাথুরে গলি, প্রাচীন খামারবাড়ি ও চমৎকার কারুকার্যময় বিশাল ফটকগুলো প্রাচীন চীনের ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলে। প্রাচীন হুয়েইচৌ (Huizhou) স্থাপত্যরীতিতে পুনঃনির্মিত ‘বাইওয়েই স্ট্রিট’ (Baiwei Street), ‘রক প্লাজা’ ও প্রাচীন ‘ইয়াং ম্যানশন’ (Yang Mansion) এখানে ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য সাক্ষ্য বহন করছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো উপত্যকা আলোয় আলোকিত হয়ে এক মায়াবী রূপ ধারণ করে, যা দেখে মনে হয় যেন আকাশের নক্ষত্রগুলো পাহাড়ের গায়ে নেমে এসেছে।

 

অভিযাত্রীদের জন্য ওয়াংশ্যান উপত্যকা এক রোমাঞ্চকর স্থান। খাড়া পাহাড়ের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে ৩৮৮ মিটার দীর্ঘ ‘ক্লিফসাইড ওয়াকওয়ে’ বা ঝুলন্ত হাঁটার পথ, যার মধ্যে ৫০ মিটার অংশ জুড়ে রয়েছে রোমাঞ্চকর ‘গ্লাস ওয়াকওয়ে’ বা কাঁচের তৈরি রাস্তা। ২৮ মিলিমিটার পুরু কাঁচের তৈরি এই পথে হেঁটে যাওয়ার সময় নিচে গভীর গিরিখাত দেখে গা শিউরে ওঠে।

গ্রীষ্মকালে এখানকার ২.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পাহাড়ি নদীতে র‍্যাফ্টিং বা ড্রিফ্টিংয়ের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রায় ১৮৫ মিটার উঁচুর পানির স্রোতে ১ ঘণ্টার এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পর্যটকদের দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করে।

এখানে ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ‘গান’ (Gan Cuisine) রন্ধনশৈলীর খাবার ও স্ফুটনাংশের স্বাদ গ্রহণ করা। স্থানীয় পাহাড়ি নদীর পানি ও উঁচু ভূমিতে জন্ম নেওয়া সয়াবিন দিয়ে তৈরি ‘ওয়াংশ্যান তোফু’ (Wangxian Tofu) পুরো অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু। এছাড়া চালের খামিরে তৈরি লণ্ঠনের আকৃতির ‘দেংঝান গুও’ (Dengzhan Guo) পিঠা পর্যটকদের রসনাবিলাস মেটায়।

প্রতিদিন সকাল ৯:১৫ থেকে রাত ২০:৩০ পর্যন্ত এই উপত্যকায় ২০টিরও বেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকশিল্প প্রদর্শিত হয়। প্রাচীন গলিগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে পর্যটকরা দেখতে পান ঐতিহ্যবাহী চীনা অপেরা, অ্যাক্রোবেটিক্স, চিত্তাকর্ষক অগ্নিশিখা নৃত্য (Fire Shows), মুখাবয়ব পরিবর্তনের বিখ্যাত ‘ফেস চেঞ্জিং’ শিল্প ও ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত। রাতের বেলার অগ্নিপ্রদর্শনী ও ক্যাম্পফায়ার পার্টি এখানকার বিনোদনের প্রধান আকর্ষণ।

কখন যাবেন?

ওয়াংশ্যান উপত্যকা ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে সেরা সময় হলো বসন্তকাল (মার্চ থেকে মে) ও শরৎকাল (সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর)। এই সময়ে আবহাওয়া চমৎকার, মনোরম ও আরামদায়ক থাকে। গ্রীষ্মকালে (জুন থেকে আগস্ট) আবহাওয়া গরম ও বৃষ্টিবহুল হলেও এ সময় ঝরনাগুলো পূর্ণ যৌবন পায় ও পাহাড়ি নদীতে রোমাঞ্চকর র‍্যাফ্টিং করার সেরা সুযোগ মেলে। আর শীতকালে (ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ভিড় অনেকটাই কম থাকে, পরিবেশ থাকে শান্ত; তবে শীতের তীব্রতা বেশি থাকে।

কীভাবে যাবেন?

ওয়াংশ্যান উপত্যকায় সরাসরি কোনো বিমানবন্দর বা বুলেট ট্রেন স্টেশন নেই। তাই আন্তর্জাতিক বা দূরদূরান্তের পর্যটকদের প্রথমে বেইজিং, সাংহাই বা গুয়াংঝু হয়ে জিয়াংসি প্রদেশের শাংরাও শহরে আসতে হয়।
১. উড়োজাহাজ বা ট্রেনে: সাংহাই, হাংঝৌ বা নানচাং শহর থেকে হাই-স্পিড ট্রেনে খুব সহজেই ‘শাংরাও রেল স্টেশন’-এ পৌঁছানো যায়। অথবা প্লেনে ‘শাংরাও সানচিংশান বিমানবন্দর’-এ নামা যায়।

২. শাংরাও থেকে উপত্যকা: শাংরাও শহর থেকে ওয়াংশ্যান উপত্যকার দূরত্ব প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। শহরের প্রধান বাস স্টেশন থেকে উয়ুয়ানগামী (Wuyuan) বাসে উঠে ‘ওয়াংশ্যান ভ্যালি’ স্টপেজে নামা যায় (সময় লাগে ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা)। এছাড়া প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সিতে ১ ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব।

৩. অন্যান্য আকর্ষণ থেকে: ইয়েলো মাউন্টেন (Yellow Mountain) থেকে গাড়িতে ৪ ঘণ্টা, জিংদেঝেন (Jingdezhen) থেকে ৩ ঘণ্টা এবং সানচিং পর্বত (Sanqing Mountain) থেকে ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টার দূরত্বে এটি অবস্থিত।

ভ্রমণ ও আবাসনের খরচাপাতি

ওয়াংশ্যান উপত্যকার প্রবেশ টিকিট, আবাসন ও খাবারের খরচের হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

প্রবেশ টিকিট: পার্ক বা পর্যটন এলাকায় প্রবেশের সাধারণ টিকিট ফি জনপ্রতি প্রায় ১০০ থেকে ১২০ ইউয়ান (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১,৭০০ থেকে ২,১০০ টাকা)।

আবাসন খরচ: পার্কের ভেতরেই থাকা-খাওয়ার অফিশিয়াল সুব্যবস্থা রয়েছে। পাহাড়ের খাড়া গায়ে অবস্থিত বিখ্যাত ঝুলন্ত হোটেল ‘বাইহে ইয়া ক্লিফসাইড রিসোর্ট’-এ থাকার খরচ সবচেয়ে বেশি, যেখানে প্রতি রাতের রুম ভাড়া ১৫০০ থেকে ৪০০০ ইউয়ানের বেশি (বাংলাদেশি টাকায় ২৫,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকার বেশি)।

এছাড়া পার্কের ভেতরে থাকা সাধারণ ‘সেলেস্টিয়াল লজ’ বা ‘ওয়াংশ্যান ভিলেজ’-এর কটেজগুলোতে প্রতি রাতে খরচ পড়বে প্রায় ৫০০ থেকে ১,২০০ ইউয়ান (৮,৫০০ থেকে ২০,০০০ টাকা)। আর পার্কের বাইরে বা শাংরাও শহরের চেইন হোটেলগুলোতে প্রতি রাতে ১৫০ থেকে ৪০০ ইউয়ানের (২,৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকা) মধ্যে বাজেট ফ্রেন্ডলি আবাসন পাওয়া যায়।

খাবার ও রাইড খরচ: বিখ্যাত ওয়াংশ্যান তোফু ও স্থানীয় স্ন্যাক্স প্রতি ডিশ ২০ থেকে ৫০ ইউয়ানের মধ্যে পাওয়া যায়। আর গ্রীষ্মকালীন পাহাড়ি র‍্যাফ্টিং রাইডের টিকিট ফি সাধারণত জনপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ ইউয়ান হয়ে থাকে।

সূত্র: চায়না ডিসকভারি, চায়না রোডস অ্যান্ড ট্রাভেল এজেন্সি, এনডিটিভি

এসএএইচ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *