চার দশকের টিকে থাকার যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলে বিপাকে ইরান
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়ে আসছে ইরান। এই দীর্ঘ সময়ে মার্কিন ও পশ্চিমা নীতি ছিল নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি ও কূটনীতির সংমিশ্রণে ইরানকে কাবু করা।
তবে সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ আগের সব পদক্ষেপ থেকে ভিন্ন ও এক নজিরবিহীন আর্থিক অবরোধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা
ইরানের ওপর ১৯৭৯ সালে প্রথম নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। সে বছর নভেম্বরে ইরানি বিপ্লবী ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে পড়ে এবং সেখানে ৫২ জনকে জিম্মি করে গোটা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। এ ঘটনার জেরে ৪৪৪ দিনের দীর্ঘ সংকটের পর ওয়াশিংটন ১৯৮০ সালে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। একইসঙ্গে ইরানের ওপর বাণিজ্য ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর ১৯৮৩ সালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে মার্কিন ঘাঁটিতে বোমা হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ১৯৮৭ সালে, তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন মার্কিন নৌযানে হামলার কারণে ইরান থেকে সব ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেন এবং দেশটিতে কিছু মার্কিন পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দেন।
১৯৯৫ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সন্ত্রাসবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগে ইরানের ওপর বাণিজ্য ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দেন। ২০০২ সালে আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনকারী দেশ হিসেবে ইরানকে তালিকাভুক্ত করেন।
এরপর ২০০৫ সালে ইরানের নির্বাচিত কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ নির্ধারিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে স্থগিতাদেশের অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে সর্বস্তরের আশঙ্কা করা হয়। ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে চার দফা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তাদের সম্পদ জব্দ করে। ২০০৮ সালে মার্কিন ব্যাংকগুলিকে ইরানের তহবিল স্থানান্তরে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করা থেকে নিষিদ্ধ করে ওয়াশিংটন।
২০১০ এবং ২০১২ সালের মধ্যে ইইউ ইরানে প্রযুক্তিগত সহায়তা বা তেল প্রযুক্তি হস্তান্তর নিষিদ্ধ করে এবং ইউরোপে থাকা শত শত সম্পদ জব্দ করে।
২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে বের হয়ে পুনরায় সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এরপর ২০১৯ সালের এপ্রিলে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন।
২০২২ সালে ইরানে নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সাধারণ মানুষের ওপর নৃশংস-নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও বেলজিয়াম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০১৩ সালে এই অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের চতুর্থ দফা নিষেধাজ্ঞা দেয় ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালে ইসরায়েলে হামলার জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ড্রোন এবং ইস্পাত শিল্পের ওপর বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
২০২৬ সালে এসে ইরানের আন্তর্জাতিক ছায়া ব্যাংকিং, অবৈধ তেলবাহী জাহাজ এবং হরমুজ প্রণালিরও পর পশ্চিমা বিশ্বের নজরদারি বাড়ে। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলে তেহরান বিশ্ব জ্বালানি রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়।
পরবর্তীতে জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতভেদের জেরে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি প্রচেষ্টা থমকে যায়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে চলতি মাসে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর ঘোষণা দেয়।
অতীতের নিষেধাজ্ঞা বনাম ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’
গত চার দশকে তেহরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছিল। তারা তৃতীয় দেশের মাধ্যমে তেল বিক্রি, ছদ্মবেশী কোম্পানি তৈরি এবং বিকল্প অনানুষ্ঠানিক আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে অর্থনীতি সচল রেখেছিল।
ঐতিহ্যগত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মূলত নির্দিষ্ট ব্যক্তি, ব্যাংক বা ইরানি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় চিহ্নিত করে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করত। বিপরীতে, ইরানের কৌশল ছিল নতুন ছদ্মবেশী কোম্পানি গঠন বা জাহাজের নাম পরিবর্তন করে অর্থ লেনদেন চালু রাখা। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিকল্প বাণিজ্যিক পথ খোলা থাকত।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পদক্ষেপ ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক ‘ডি-ডে নরম্যান্ডি অবতরণ’-এর সঙ্গে তুলনা করে এক নজিরবিহীন অভিযানের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ রাখা যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলার ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে।
বেসেন্ট বলেন, “আমরা বিশ্বজুড়ে ইরানের আর্থিক সংযোগগুলোর বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক আক্রমণ শুরু করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো এই স্বৈরাচারী শাসনকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক জীবনরেখা ছিন্ন করা, যতক্ষণ না তেহরান একা হয়ে পড়ে।”
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন কৌশলের মূল উদ্দেশ্য কেবল ইরানকে কোণঠাসা করা নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ সামলে টিকে থাকার যে বৈশ্বিক মাধ্যমগুলো ছিল, তা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। ইরান এতদিন মধ্যস্থতাকারী বা ভুয়া কোম্পানি বদলে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারলেও, সমগ্র বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে টিকে থাকা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তথ্যসূত্র: ব্যারোন’স ও দ্য আরব উইকলি
