অপহরণের এক সপ্তাহ পর পূর্বাচল থেকে কিশোরী উদ্ধার, প্রধান অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
সকালে স্কুলের পোশাক পরে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছর ১১ মাস বয়সী কিশোরী। সেদিন ছিল পরীক্ষা। পরিবারেরও কোনো সন্দেহ ছিল না— পরীক্ষা শেষে প্রতিদিনের মতোই বাড়ি ফিরবে মেয়েটি। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা। মেয়েটি আর ফিরল না। প্রথমে পরিবার ভেবেছিল, হয়তো কোথাও আটকে গেছে। আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন— সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ শুরু হলো। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না তাকে।
এরপর সামনে আসে আরও ভয়ংকর এক অভিযোগ।
পরিবারের দাবি, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পাকা সড়ক থেকে কয়েকজন মিলে ওই কিশোরীকে একটি সিএনজিতে তুলে নিয়ে গেছে। অভিযোগের তীর স্থানীয় যুবক জাহিদ হাসান রাজের দিকে।
নিখোঁজের পর কেটে যায় একদিন, দুইদিন, তিনদিন। এভাবে এক সপ্তাহ। অবশেষে গতকাল রবিবার দিবাগত রাতে মিলল সন্ধান।
তবে নিজের এলাকায় নয়— পূর্বাচল থেকে কিশোরীকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। একই অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসান রাজকে (২৫)।
যেভাবে শুরু ঘটনা
ঘটনাটি গত ৩১ আগস্ট সকালে কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের পানজোড়া এলাকায় ঘটে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, কিশোরী নিয়মিত পড়াশোনা করত। স্থানীয় যুবক জাহিদ হাসান রাজ প্রায় প্রতিদিন তাদের বাড়িতে গিয়ে তাকে প্রাইভেট পড়াতেন।
৩১ আগস্ট বিদ্যালয়ে পরীক্ষা থাকায় সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে স্কুলের পোশাক পরে বাড়ি থেকে বের হয় কিশোরী।
কিন্তু পরীক্ষা শেষ হলেও বাড়ি ফেরেনি সে।
সময় যত গড়াতে থাকে, পরিবারের উৎকণ্ঠাও বাড়তে থাকে। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি।
একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পাকা সড়কে পৌঁছানোর পর জাহিদ হাসান রাজসহ কয়েকজন কিশোরীকে জোরপূর্বক একটি সিএনজিতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে— এমনই অভিযোগ করেন তারা।
যদিও মেয়ের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা জাহিদ হাসান রাজের বাড়িতেও যান।
এজাহারে কিশোরীর মা অভিযোগ করেছেন, সেখানে মেয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কিশোরীকে জাহিদ হাসান রাজ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানেন বলে জানান।
কিন্তু মেয়েটি কোথায় আছে— সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
বরং তাকে ফেরত দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেয়ের সন্ধান চেয়ে প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা মারপিটে উদ্যত হন বলেও অভিযোগ করেছেন কিশোরীর মা। এমনকি বিষয়টি নিয়ে দরবার বা সালিশ করলে কিশোরীর জানমালের ক্ষতি এবং পরিবারের সদস্যদের খুন-জখমের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়।
রাতেই থানায় অভিযোগ
মেয়েকে না পেয়ে ঘটনার দিন রাতেই কালীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেন কিশোরীর মা।
অভিযোগে জাহিদ হাসান রাজকে প্রধান করে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭/৩০ ধারায় অপহরণ মামলা রুজু করে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ।
মামলা হওয়ার পর থেকেই কিশোরীকে উদ্ধারে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করে পুলিশ।
এক সপ্তাহ পর সন্ধান
নিখোঁজের পর থেকেই অনুসন্ধান চলছিল। কোথায় রাখা হয়েছে কিশোরীকে, কারা তাকে নিয়ে গেছে, কীভাবে তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হয়েছে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল পুলিশ।
অবশেষে গতকাল রবিবার দিবাগত রাতে পূর্বাচল এলাকায় অভিযান চালায় কালীগঞ্জ থানা পুলিশ।
সেখানেই পাওয়া যায় নিখোঁজ কিশোরীকে।
একই অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসান রাজকে।
জাহিদ হাসান রাজ কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের দক্ষিণ পানজোড়া গ্রামের জামান রাজের ছেলে।
যা বলছে পুলিশ
কিশোরী উদ্ধারের পর মামলাটি আপস-মীমাংসার জন্য স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পক্ষ বাদীকে বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছে— এমন অভিযোগও উঠেছে।
তবে এ ধরনের কোনো আপসের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হওয়ার পর থানায় কিংবা অন্য কোথাও বসে আপস-মীমাংসার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আদালতেই হবে।
তিনি জানান, ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা হয়েছে। ওই মামলায় কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার জাহিদ হাসান রাজকে আজ সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে গাজীপুর আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কালীগঞ্জ থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) অপূর্ব কুমার বাইন বলেন, মামলা রুজুর পর থেকেই ভুক্তভোগীকে উদ্ধারে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। একপর্যায়ে পূর্বাচল এলাকা থেকে কিশোরীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। একই অভিযানে মামলার প্রধান অভিযুক্তকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, কিশোরীকে কীভাবে, কার মাধ্যমে এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল— এসব বিষয় এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
