অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার লড়াই জমিয়ে তুলেছে বাংলাদেশ
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) চলতি চক্রে হঠাৎ করেই জমে উঠেছে শীর্ষ দুইয়ে থাকার লড়াই। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় শুধু সিরিজের সমীকরণই বদলায়নি, খুলে দিয়েছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনাও। টেবিলের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট শতাংশ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডও এখন তাদের খুব কাছাকাছি। গলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় পেয়ে ভারতও লড়াইয়ে ফিরেছে, যদিও তাদের সামনে এখনও কঠিন পথ।
চলতি ডব্লিউটিসি চক্রে এখনো ৩৬টি টেস্ট বাকি। ফলে সামনে যে কোনো সিরিজের ফলাফলই বদলে দিতে পারে ফাইনালের হিসাব।
অস্ট্রেলিয়ার পথ কঠিন করে দিল বাংলাদেশ
ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার হার ছিল চলতি চক্রের অন্যতম বড় অঘটন। সেই হারের পরও ৯ টেস্টে ৭ জয় ও ২ হারে ৭৭.৭৮ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে অস্ট্রেলিয়া। তবে আগের তুলনায় তাদের অবস্থান এখন অনেকটাই নড়বড়ে।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে অন্তত ৬০ শতাংশ পয়েন্ট পেতে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন আরও ৭৫ পয়েন্ট। বাকি ১৩ টেস্টে ৬ জয় ও একটি ড্র পেলেই তারা সেই সীমায় পৌঁছাতে পারবে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সামনে যে সূচি, সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাকি ১৩ টেস্টের মধ্যে পাঁচটি খেলতে হবে ভারতে, যেখানে শেষ ১২ টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার জয় মাত্র দুটি। পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে খেলতে হবে তিনটি টেস্ট।
অস্ট্রেলিয়া যদি বাকি ম্যাচগুলোর মধ্যে ৭টি জেতে, তাদের পয়েন্ট শতাংশ দাঁড়াবে ৬৩.৬৩। আর ৮ জয় ও ৫ হারে তা হবে ৬৮.১৮ শতাংশ। অর্থাৎ ডারউইনের হার তাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান বেশ শক্ত
৭৫ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পরেই আছে দক্ষিণ আফ্রিকা। চার টেস্টে তিন জয় ও এক হারে তাদের অবস্থান বেশ ভালো।
দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বড় সুবিধা হলো, বাকি ১০ টেস্টের আটটিই তারা খেলবে নিজেদের মাঠে। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে তারা। একমাত্র শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজটি হবে বিদেশের মাটিতে।
চলতি চক্রে পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাটিতে তিনটি সিরিজ খেলেও দারুণ করেছে প্রোটিয়ারা। পাকিস্তানে সিরিজ ১-১ ড্র করার পর ভারতকে তাদের মাটিতে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছে তারা।
বাকি ম্যাচে ৫ জয় ও ২ ড্র পেলেই ৬০ শতাংশে পৌঁছে যাবে দক্ষিণ আফ্রিকা। ৭ জয় ও ৩ হার হলে তাদের পয়েন্ট শতাংশ হবে ৭১.৪৩- যা ফাইনালে ওঠার জন্য অত্যন্ত শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।
নিউজিল্যান্ডও আছে সুবিধাজনক অবস্থানে
ছয় টেস্টে চার জয়, এক হার ও এক ড্রয়ে নিউজিল্যান্ডের পয়েন্ট শতাংশ ৭২.২২। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাঠে এবং ইংল্যান্ডের মাটিতে সিরিজ জয়ের পর কিউইদের অবস্থানও বেশ ভালো।
তবে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে অস্ট্রেলিয়া সফর। বাকি ১০ টেস্টের চারটি হবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, যা তাদের ফাইনালের পথের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাকি ১২০ পয়েন্ট থেকে অন্তত ৬৪ পয়েন্ট পেলে ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে নিউজিল্যান্ড। ৫ জয় ও ১ ড্রতেই সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব।
তবে শুধু ঘরের মাঠে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে হারালেই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত হবে না। ছয় জয় ও তিন হারে নিউজিল্যান্ডের পয়েন্ট শতাংশ হবে ৬৪.৫৮। সাত জয় ও তিন হার হলে তা দাঁড়াবে ৭০.৮৩ শতাংশে।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ নিজেদের ডব্লিউটিসি ফাইনালের হিসাবের মধ্যে নিয়ে এসেছে। পাঁচ টেস্টে ৩ জয়, ১ হার ও ১ ড্রয়ে বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ এখন ৬৬.৬৭।

বাকি সাত টেস্টের মধ্যে চারটি হবে ঘরের মাঠে- ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। এ চারটি ম্যাচে চার জয় পেলেই বাংলাদেশ ৬০ শতাংশের সীমা পেরিয়ে যাবে।
আর যদি ওই চার জয়ের সঙ্গে আরও একটি টেস্টে জয় আসে, তাহলে বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ উঠে যাবে ৬৯.৪৪-এ। তখন ফাইনালের দৌড়ে টাইগারদের অবস্থান হয়ে উঠবে অত্যন্ত শক্তিশালী।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘরের মাঠের ম্যাচগুলো থেকে সর্বোচ্চ পয়েন্ট আদায় করা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের পর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে খেলতে হবে বাংলাদেশকে। ফলে ঘরের মাঠে পয়েন্ট হারানোর সুযোগ খুবই কম।
জয় পেলেও ভারতের সামনে কঠিন পথ
গলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় ভারতকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। টেস্ট শুরুর আগে ৪৮.১৫ শতাংশ থেকে তাদের পয়েন্ট শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৩.৩৩।
তবে ফাইনালে যেতে হলে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে শুভমান গিলদের। বাকি আট টেস্ট থেকে ৬৬ পয়েন্ট পেলেই তারা ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে। এর জন্য ৫ জয় ও ২ ড্র অথবা সরাসরি ৬ জয় প্রয়োজন।
গত ডব্লিউটিসি চক্রে ফাইনালে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট শতাংশ ছিল যথাক্রমে ৬৯.৪৪ ও ৬৭.৫৪। তাই ভারতের জন্য শুধু ৬০ শতাংশ যথেষ্ট নাও হতে পারে।

ভারতের বাকি আট টেস্টের সাতটিই বর্তমান শীর্ষ তিন দলের বিপক্ষে। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে দুটি এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠে পাঁচটি টেস্ট খেলবে তারা। ফলে গলেতে জয় এলেও ভারতের সামনে ভুল করার সুযোগ খুবই কম। ছয় জয় ও দুই হারে ভারতের পয়েন্ট শতাংশ হবে ৬২.৯৬। সাত জয় ও এক হার হলে তা দাঁড়াবে ৬৮.৫২ শতাংশে।
শ্রীলঙ্কার জন্য কঠিন সমীকরণ
পাঁচ টেস্টে মাত্র একটি জয়, দুটি হার ও দুটি ড্র- শ্রীলঙ্কার পয়েন্ট শতাংশ মাত্র ৩৩.৩৩। বাকি সাত টেস্টে ৬৭ পয়েন্ট প্রয়োজন তাদের ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে। অর্থাৎ ৫ জয় ও ২ ড্র অথবা ৬ জয় প্রয়োজন।
ছয় জয় ও এক হার হলে তাদের পয়েন্ট শতাংশ হবে ৬৩.৮৯। আর বাকি সাতটি টেস্টেই জয় পেলে সর্বোচ্চ ৭২.২২ শতাংশে যেতে পারবে তারা। তবে শুরুতেই ভারতের বিপক্ষে চলমান সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়াতে হবে লঙ্কানদের।
ইংল্যান্ডের ফাইনালের আশা প্রায় শেষ
১৩ টেস্টে মাত্র ৪ জয়, ৮ হার ও ১ ড্র- ইংল্যান্ডের ডব্লিউটিসি অভিযান কার্যত হতাশাজনক। তাদের পয়েন্ট শতাংশ মাত্র ২৪.৩৬। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধীর ওভার রেটের শাস্তি। এখন পর্যন্ত ১৪ পয়েন্ট কাটা গেছে ইংল্যান্ডের। ফলে চার জয় ও এক ড্র থেকে পাওয়া ৫২ পয়েন্ট কমে হয়েছে মাত্র ৩৮।
বাকি আটটি টেস্টের সবগুলো জিতলেও, আর কোনো পয়েন্ট না কাটলে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ পয়েন্ট শতাংশ হবে ৫৩.১৭। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা তাদের প্রায় নেই বললেই চলে।
পাকিস্তানেরও বড় ধাক্কা
ছয় টেস্টে দুটি জয় ও চার হারে পাকিস্তানের পয়েন্ট শতাংশ ২২.২২। এর সঙ্গে রয়েছে ৮ পয়েন্টের পেনাল্টি। বাকি সাতটি টেস্টের সবগুলো জিতলে তারা সর্বোচ্চ ৬৪.১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারবে। ছয় জয় ও এক ড্র হলে ৫৮.৯৭ এবং ছয় জয় ও এক হার হলে ৫৬.৪১ শতাংশে শেষ করবে।

অর্থাৎ হিসাবের দিক থেকে পাকিস্তান এখনও পুরোপুরি ছিটকে যায়নি, কিন্তু তাদের সামনে এখন প্রায় নিখুঁত পারফরম্যান্সের প্রয়োজন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম
১২ টেস্টে মাত্র দুটি জয়, আট হার ও দুটি ড্রয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পয়েন্ট শতাংশ ২০.৮৩। বাকি মাত্র দুটি টেস্ট খেলবে তারা- দুটিই বাংলাদেশের বিপক্ষে। সবগুলো জিতলেও সর্বোচ্চ ৩২.১৪ শতাংশে শেষ করতে পারবে ক্যারিবীয়রা। ফলে ফাইনালের দৌড় থেকে কার্যত ছিটকে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ফাইনালের দৌড়ে এখন কারা?
ডারউইনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের পর সমীকরণটা অনেকটাই পাল্টে গেছে। অস্ট্রেলিয়া এখনও শীর্ষে থাকলেও তাদের সামনে কঠিন সূচি। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড খুব কাছেই রয়েছে। বাংলাদেশও এখন বাস্তবসম্মতভাবে ফাইনালের স্বপ্ন দেখতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের হাতে সুযোগ থাকলেও তাদের বাকি ম্যাচগুলোর বড় অংশই কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। তাই গলেতে জয় তাদের আশার আলো দেখালেও সামনে আরও বড় পরীক্ষার অপেক্ষা।
বর্তমান অবস্থায় অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও বাংলাদেশ—এই চার দলকে ফাইনালের দৌড়ে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। তবে ভারতের বাকি আট টেস্টের ফলও পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
আইএইচএস/
