‘আমি বোকা বলেই তোমাকে সংসারে রেখেছি’


বাংলাদেশ ও ভারতের বাঙালি সমাজে বহু নারীকে দাম্পত্য জীবনে নিয়মিত দুটি কথা শুনতে হয়- ‘তুমি সন্তানদের নষ্ট করেছ’ এবং ‘আমি বোকা বলেই তোমাকে এখনো সংসারে রেখেছি, অন্য কেউ হলে অনেক আগেই বিদায় করে দিত।’

এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়। এগুলো আসলে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক পারিবারিক সংস্কৃতির বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র- যার উদ্দেশ্য দায় চাপানো, স্ত্রীর আত্মসম্মান চুরমার করা এবং তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে নিয়ন্ত্রণ করা।

সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে, কথা না শুনলে বা কোনো ভুল করলেই তার সব দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় মায়ের ঘাড়ে। অথচ একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে মা-বাবা উভয়েরই সমান ভূমিকা থাকে।

আমাদের সমাজে বাবার ভূমিকাটি সুবিধাজনকভাবে নির্ধারিত। সন্তান সফল হলে বলা হয় ‘বাবার মতো হয়েছে’, আর ব্যর্থ হলে অভিযোগের আঙুল ওঠে মায়ের দিকে।

বাস্তবে একজন মা সন্তান পালনের অধিকাংশ অদৃশ্য শ্রম বহন করেন- খাওয়ানো, পড়ানো, অসুস্থতায় জেগে থাকা কিংবা মানসিক বিকাশ বোঝা। এত কিছুর পর সন্তানের ব্যর্থতার জন্য যখন তাকে এককভাবে দায়ী করা হয়, তখন সেটি কেবল অন্যায় নয়, তার বছরের পর বছর দেওয়া শ্রম ও ত্যাগকে অস্বীকার করা।

“আমি বোকা বলেই তোমাকে সংসারে রেখেছি”- এই বাক্যে কোনো ভালোবাসা নেই, আছে ক্ষমতার নগ্ন ঘোষণা। স্বামীরা এর মাধ্যমে বোঝাতে চান, সংসারে স্ত্রীর অবস্থান কোনো অধিকার বা অংশীদারত্ব নয়, বরং স্বামীর দয়া।

সংসার কি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান, যেখানে স্বামী মালিক আর স্ত্রী সাময়িক কর্মচারী? একটি পরিবার গড়ে তুলতে নারীর সময়, শ্রম, মেধা ও আবেগ জড়িয়ে থাকে। অনেক নারী নিজের শিক্ষা ও ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ান। সেই নারীকে “রেখেছি” বলা মানে সংসারে তার সমান মালিকানা ও মানবিক মর্যাদাকে সরাসরি অস্বীকার করা।

আর “অন্য কেউ হলে তাড়িয়ে দিত” বাক্যটি একটি সুপরিচিত মনস্তাত্ত্বিক ভীতি প্রদর্শনের কৌশল বা ‘গ্যাসলাইটিং’। এর মাধ্যমে নারীকে বোঝানো হয় যে তিনি অযোগ্য এবং তার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বারবার এই কথা শুনতে শুনতে একটা সময় নারী নিজেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন।

পরিবারের শিশুরা এসব দেখে বড় হয়। বাবা যখন মাকে অপমান করেন এবং মা নীরবে তা সহ্য করেন, তখন ছেলেও শেখে যে স্ত্রীর সঙ্গে এমন আচরণই স্বাভাবিক। আর মেয়ে সন্তান ভাবতে শুরু করে দাম্পত্যে অপমান সহ্য করাই নারীর নিয়তি। এভাবে একটি অসুস্থ মানসিকতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।

অনেক পুরুষ এমন পরিবারে বড় হয়েছেন যেখানে বাবাকে একচ্ছত্র সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু শৈশবের ভুল শিক্ষা কখনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অপমানজনক আচরণের অজুহাত হতে পারে না। নিজের আচরণ ও ভাষার বদল ঘটানোর দায় প্রতিটি মানুষের নিজের।

সংসার কেবল টিকে থাকাই কোনো সাফল্য নয়; মূল প্রশ্ন হলো- সেই সংসারে সম্মান, নিরাপত্তা ও পরস্পরের কথা বলার সমান সুযোগ আছে কি না।

সুস্থ দাম্পত্যের ভাষা হুমকি বা দোষারোপের হয় না। সেখানে সমস্যার মুখে দাঁড়িয়ে বলা যায়, ‘সন্তানের এই সমস্যাটি আমরা দুজন মিলে কীভাবে সমাধান করব?’ কিংবা ‘তোমার এই ব্যবহারে আমি কষ্ট পেয়েছি, চল কথা বলি।’

কোনো স্ত্রীকে সংসারে ‘দয়া করে’ রাখা হয় না, তিনি সেই সংসারের সমান অংশীদার। সন্তানও শুধু মায়ের একার দায় নয়। তাই স্ত্রীকে অপমানের আগে একজন বাবার ভাবা উচিত তিনি সন্তানকে কতটা সময় দিয়েছেন।

দাম্পত্যের মূল শর্ত শুধু একসঙ্গে একই ছাদের নিচে বাস করা নয়, পরস্পরকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। যে ভাষা সঙ্গীর মর্যাদা কেড়ে নেয়, তাকে ‘রাগের মাথায় বলা কথা’ বলে হালকা করার সময় পার হয়ে গেছে।

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি,
স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা
পাঠানোর ঠিকানা –
[email protected]



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *