আযাদের মামলার শুনানি মুলতবি, প্রধান কৌঁসুলিকে সতর্ক করল আপিল বিভাগ
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবুল কালাম আযাদের আপিলের অনুমতি প্রশ্নে শুনানি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
একইসঙ্গে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলিকে আদালত সতর্ক করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. রেজাউল হক নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ মুলতবি আদেশের পাশাপাশি এ সতর্ক করে।
আদালতে আবুল কালাম আযাদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী, ইমরান এ সিদ্দিকী, আইনজীবী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (নাজিব মোমেন) ও মীর ওসমান বিন নাসিম। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম।
আদেশের পর এহসান এ সিদ্দিকী বলেন, আদালত আপিল শুনানিটি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছেন। অবকাশকালীন ছুটির পর এটি আবার শুনানির জন্য উঠবে। তখন মূল আপিল ও আবেদনের ওপর একসঙ্গে শুনানি হবে।
আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শুরু হচ্ছে। ছুটি শেষে ২৫ অক্টোবর নিয়মিত আদালত বসবে।
আযাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিতের মেয়াদ আগামী ২২ অক্টোবর শেষ হলেও আদেশ হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী।
প্রধান কৌঁসুলিকে আদালত সতর্ক করে দিয়েছেন জানিয়ে আযাদের এ আইনজীবী বলেন, বিচারাধীন বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে বেশি কথা বলার কারণে চিফ প্রসিকিউটরকে আদালত সতর্ক করেছেন এবং এ নিয়ে মন্তব্য করা থেকে তাকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আদালত আমাদের বিচারাধীন বিষয়ে অগ্রিম মন্তব্য না করতে বলেছেন। আমরা এখন থেকে অগ্রিম মন্তব্য করব না।
মানবতাবিরোধী অপরাধের ওই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১৩ বছর আগে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে গত ৬ জুলাই বিলম্ব মার্জনাসহ আপিল করেন আবুল কালাম আযাদ। এতে ৪ হাজার ৯১৫ দিনের বিলম্ব মার্জনা চাওয়ার পাশাপাশি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিতের আবেদন করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় আপিল ও সাজা স্থগিত চেয়ে আযাদের করা আবেদন শুনানির জন্য গত ১৭ আগস্ট আপিল বিভাগে ওঠে। সেদিন আযাদের আপিল খারিজ চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন।
এরপর বিষয়টি মঙ্গলবারের কার্যতালিকায় ৬ নম্বর ক্রমিকে ওঠে। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ চার সপ্তাহের জন্য শুনানি মুলতবি করেন।
এর আগে সোমবার নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান কৌঁসুরি আমিনুল ইসলাম বলেছিলেন, আপিল দায়েরের শর্তে আবুল কালাম আযাদকে আত্মসমর্পণের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা বেআইনি ও আইনসম্মত নয়।
ট্রাইব্যুনাল আইনে রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার কথা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনকে অতিক্রম করে কোনো আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের নেই।
তবে যেকোনো সাজা স্থগিত, রিমিট বা বাতিল করার সরকারের এখতিয়ার রয়েছে বলে ভাষ্য প্রধান কৌঁসুলির। আবুল কালাম আযাদের মামলার আগের শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপিলের সময়সীমা–সংক্রান্ত আইনগুলো আপিল বিভাগে তুলে ধরা হয়েছিল বলেও তিনি বলেছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় ছিল আবুল কালাম আযাদের মামলায়। ওই রায়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটক, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ আটটি অভিযোগের মধ্যে সাতটি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে ফেরেন আবুল কালাম আযাদ। এরপর তিনি সাজা স্থগিত চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তার দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাকে আপিল করতে হবে—এমন শর্ত দেওয়া হয়।
শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন আবুল কালাম আযাদ। পরে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) করেন।
বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম
