কাঁঠাল থেকে হচ্ছে বিস্কুট, খুলছে সম্ভাবনার দ্বার
কখনো বাগানের গাছে ঝুলতে ঝুলতে নষ্ট হচ্ছে কাঁঠাল, আবার কোথাও মাটিতে পড়ে থাকছে পচে যাওয়া এই ফল। কাঁঠালের ভরা মৌসুমে গাজীপুরের চেনা এই দৃশ্য যেন কৃষকের দীর্ঘশ্বাসের গল্প। গাছে ফলন আছে, কিন্তু সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় দাম পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার টন কাঁঠালের জায়গা হয় বাগানের মাটিতে। তবে, সেই পুরনো গল্প এবার বদলে যাচ্ছে।
কাঁঠাল শুধু এখন এক মৌসুমে খাওয়ার ফল নয়, চাইলেই এই জাতীয় ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা যায় বছরজুড়ে খাওয়ার মতো নানা খাদ্যপণ্য। এমন ভাবনা থেকেই গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া শুরু করেছেন কাঁঠাল দিয়ে বিস্কুট তৈরির প্রক্রিয়া।
একদিকে কাঁঠালের অপচয় কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদিত ফলের নতুন বাজার—এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তৈরি হচ্ছে তার ‘কাঁঠালের বিস্কুট’।
কাঁঠালের রস থেকে বিস্কুট
আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়ার কারখানায় ঢুকলেই চোখে পড়ে ব্যস্ততা। পাকা কাঁঠাল থেকে কোষ বের করে প্রথমে তা ব্লেন্ড করা হয়। এর পর রসের সঙ্গে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ মেশানো হয়। কোনো কৃত্রিম ফ্লেভার বা রাসায়নিক ছাড়াই তৈরি হয় বিস্কুটের মণ্ড।
প্রধান কারিগর মানিক মিয়া জানান, মণ্ড প্রস্তুত হওয়ার পর তা টেবিলে নিয়ে ডাইসের মাধ্যমে কেটে বিস্কুটের আকৃতি দেওয়া হয়। এরপর প্রতিটি ট্রেতে ৩৬টি করে বিস্কুট সাজানো হয়। এমন ৩৬টি ট্রে একটি ট্রলিতে রেখে দেওয়া হয় ওভেনে।
প্রায় ২৫ মিনিট তাপ দেওয়ার পর বেরিয়ে আসে কাঁঠালের বিস্কুট। ঠান্ডা হওয়ার পর প্যাকেটজাত করে চলে যায় বাজারে। একটি বক্সে থাকে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট।
গাছের ফল থেকে অনলাইনের অর্ডার
কাঁঠালের এই নতুন রূপ ইতোমধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে ক্রেতাদের মধ্যে। বিশেষ করে অনলাইনে বাড়ছে অর্ডার।
স্টিড ফাস্ট কুরিয়ারের কর্মী রাকিব বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে তিনি মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলসের ‘মেহমান ফুড’ ব্র্যান্ডের কাঁঠালের বিস্কুটের অনলাইন অর্ডার নিয়ে যাচ্ছেন।
তার অভিজ্ঞতা— দিন দিন অর্ডারের পরিমাণ বাড়ছে। একবার কিনে আবারও অর্ডার করছেন অনেক পুরনো ক্রেতা। কখনো একই দিনে একাধিকবারও অর্ডার নিতে হচ্ছে।
কাঁঠালের রাজধানীতে অপচয়ের আক্ষেপ
গাজীপুরকে বলা হয় কাঁঠালের রাজধানী। এ জেলার ৯ হাজার ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠাল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে শুধু শ্রীপুর উপজেলাতেই উৎপাদন হয় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। শ্রীপুরের লাল মাটিতে উৎপাদিত কাঁঠাল স্বাদ, মিষ্টতা ও গুণমানে বেশ পরিচিত।
বৈশাখ থেকে ভাদ্র—এই দীর্ঘ সময়ে গাজীপুরের গ্রামগুলোতে গাছে গাছে দেখা যায় কাঁঠাল। কিন্তু, বিপুল উৎপাদনের বিপরীতে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় মৌসুম শেষে বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়।
কাঁঠালচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, “প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টাকার কাঁঠাল সংরক্ষণের অভাবে বাগানেই পচে নষ্ট হয়। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা গেলে কৃষকের উৎপাদিত ফলের মূল্য বাড়বে এবং চাষিরাও লাভবান হবেন।”
বিদেশের অভিজ্ঞতা, দেশি ফলের নতুন ব্যবহার
উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়ার ভাবনা এসেছে কিছুটা ভিন্ন জায়গা থেকে। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান ভ্রমণের সময় তিনি দেখেছেন, কীভাবে এসব দেশে কাঁঠালকে শুধু ফল হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশে ফিরে কাঁঠাল নিয়ে নতুন কিছু করার চিন্তা শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে কাঁঠালের বিস্কুট তৈরির উদ্যোগ নেন। এখন তার পরিকল্পনা আরো বড়। ভবিষ্যতে কাঁঠালের চিপসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের কথা ভাবছেন তিনি।
তার মতে, নতুন এসব খাদ্যপণ্য সহজে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে সরকার যদি প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে ভ্যাট ও ট্যাক্স সুবিধা দেয়, তাহলে সুলভ মূল্যে এসব পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
গবেষণার সঙ্গে উদ্যোক্তার উদ্যোগের মিল
কৃষি গবেষকরাও কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের এই উদ্যোগকে দেখছেন সম্ভাবনার চোখে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেছেন, “দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও প্রতিবছর এর একটি বড় অংশ অপচয় হয়। তাই, অপচয় কমাতে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির বিকল্প নেই।”
তিনি জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ ইতোমধ্যে কাঁঠালভিত্তিক প্রায় ২০টিরও বেশি প্রযুক্তি ও উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তি বিভিন্ন উদ্যোক্তার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কিছু উদ্যোক্তা কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করে বাজারজাতও করছেন।
শ্রীপুরের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়ার কাঁঠালের বিস্কুট তৈরির উদ্যোগকেও আশাব্যঞ্জক বলে মনে করেন তিনি।
বিস্কুটে শুধু স্বাদ নয়, সম্ভাবনাও
গবেষকদের মতে, কাঁঠালের বীজ, কাঁচা ও পাকা কাঁঠাল শুকিয়ে পাউডার তৈরি করা সম্ভব। এসব উপাদানে প্রোটিন, মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবারসহ বিভিন্ন পুষ্টিগুণ রয়েছে।
নির্দিষ্ট অনুপাতে আটা বা ময়দার সঙ্গে এসব পাউডার মিশিয়ে তৈরি করা যেতে পারে পাপড়, কুকিজ, বিস্কুট, কেক, ক্যান্ডি ও আইসক্রিমসহ নানা খাদ্যপণ্য। পাকা কাঁঠালের পাল্প দিয়ে বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে।
ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরীর মতে, এসব পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়লে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি তৈরি হবে কর্মসংস্থান। বাড়বে পারিবারিক আয়, অবদান রাখা সম্ভব হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায়। একই সঙ্গে কমানো যাবে কাঁঠালের অপচয়।
যে কাঁঠাল একদিন পচে যেত, সেটিই এখন সম্ভাবনার পণ্য
গাজীপুরের বাগানে প্রতি বছর কাঁঠাল হয় বিপুল পরিমাণে। মৌসুমে বাজার ভরে যায়, দাম কমে যায়, আর সংরক্ষণের অভাবে অনেক ফল শেষ পর্যন্ত পচে যায়। আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়ার উদ্যোগ সেই অপচয়ের জায়গাতেই নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।
গাছ থেকে নামানো একটি কাঁঠাল হয়তো এক দিনে খেয়ে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু, সেই কাঁঠালকে যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিস্কুট, চিপস কিংবা অন্য কোনো খাদ্যপণ্যে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে জাতীয় ফলটির আয়ু যেমন বাড়ে, তেমনই বাড়ে এর মূল্যও।
তাই, কাঁঠালের মৌসুম শেষ হলেও যদি কাঁঠালের স্বাদ মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়, তাহলে সেটি শুধু একটি বিস্কুটের সাফল্য নয়; বরং কৃষকের উৎপাদিত ফলের অপচয় ঠেকিয়ে কাঁঠালকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরির গল্প।
